
মাটির নিচে আরেক শহর! ৮৫ মিটার গভীরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের বিস্ময়
একটি বাড়ির দেয়াল ভাঙতে গিয়ে বেরিয়ে এল অন্ধকার সুড়ঙ্গ। সেই সুড়ঙ্গ ধরে এগোতেই একের পর এক ঘর, রান্নাঘর, খাদ্যগুদাম, পানির কূপ, উপাসনালয়—এমনকি গবাদিপশু রাখার জায়গা! শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও তুরস্কে সত্যিই রয়েছে এমন এক বিস্ময়কর ভূগর্ভস্থ নগরী। নাম ডেরিনকুয়ু। মাটির প্রায় ৮৫ মিটার গভীরে বিস্তৃত এই প্রাচীন স্থাপনায় একসময় হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারত বলে ধারণা করা হয়।
পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসে বিস্ময়ের শেষ নেই। কোথাও মরুভূমির বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পিরামিড, কোথাও পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে মন্দির, আবার কোথাও মাটির নিচে চাপা পড়ে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া নগরীর স্মৃতি। কিন্তু তুরস্কের ডেরিনকুয়ু যেন এসব বিস্ময়ের মধ্যেও ব্যতিক্রম।
এখানে প্রাচীন মানুষ আকাশের দিকে নয়, নির্মাণ করেছিল মাটির গভীরে। এমন এক জটিল স্থাপনা, যেখানে ছিল বসবাস, খাদ্য সংরক্ষণ, পানি সংগ্রহ, ধর্মীয় উপাসনা এবং শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আধুনিক নির্মাণযন্ত্র ছাড়াই কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই বিশাল ভূগর্ভস্থ নগরী? আর কেনই-বা মানুষ দিনের আলো ছেড়ে মাটির এত গভীরে আশ্রয় নিয়েছিল?

দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অজানা পৃথিবী
ডেরিনকুয়ুর আধুনিক পুনরাবিষ্কারের গল্পটি রোমাঞ্চকর। ১৯৬৩ সালে তুরস্কের কাপ্পাদোকিয়া অঞ্চলে একটি বাড়ি সংস্কারের সময় দেয়ালের পেছনে অদ্ভুত এক ফাঁকা জায়গার সন্ধান পাওয়া যায়। বহুল প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, বাড়ির দেয়াল ভাঙার পর একটি গোপন কক্ষের অস্তিত্ব সামনে আসে। সেই কক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিল আরও কিছু সুড়ঙ্গ।
পরবর্তী অনুসন্ধানে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে ভূগর্ভস্থ এক বিশাল স্থাপনা। অন্ধকার সুড়ঙ্গের পর সুড়ঙ্গ, অসংখ্য কক্ষ এবং বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত চলাচলের পথ দেখে গবেষকরাও বিস্মিত হন।
তবে বাড়ির দেয়াল ভেঙে নগরী আবিষ্কারের ঘটনাটি মূলত প্রচলিত বিবরণের অংশ। নিশ্চিতভাবে জানা যায়, ১৯৬৩ সালে ডেরিনকুয়ুর ভূগর্ভস্থ নগরী পুনরাবিষ্কৃত হয় এবং ১৯৬৭ সালে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
অর্থাৎ, যে স্থাপনার ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো, আধুনিক পৃথিবী তার বিস্ময়কর বিস্তার সম্পর্কে নতুন করে জানতে শুরু করে মাত্র কয়েক দশক আগে।

মাটির ৮৫ মিটার নিচে কী আছে?
তুরস্কের মধ্যাঞ্চলের নেভশেহির প্রদেশে অবস্থিত ডেরিনকুয়ু। এটি ঐতিহাসিক কাপ্পাদোকিয়া অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ নগরীটির গভীরতা প্রায় ৮৫ মিটার, অর্থাৎ প্রায় ২৭৯ ফুট। এই গভীরতার বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে বসবাসের কক্ষ, সরু সুড়ঙ্গ, খাদ্য সংরক্ষণের স্থান, আস্তাবল, উপাসনালয় এবং বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা।
ডেরিনকুয়ুকে অনেক সময় ১৮ স্তরের ভূগর্ভস্থ শহর বলা হয়। তবে এর মোট স্তরসংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, বর্তমানে আটটি স্তরের অংশবিশেষ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
কল্পনা করুন, মাটির এত গভীরে একের পর এক কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। কোথাও সরু পথ ধরে নিচে নামতে হয়, কোথাও মাথা নিচু করে এগোতে হয়। আবার কোথাও সুড়ঙ্গ গিয়ে মিশেছে অপেক্ষাকৃত বড় কক্ষে।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতেও এমন স্থাপত্য বিস্ময় জাগায়।

একসঙ্গে ২০ হাজার মানুষের আশ্রয়!
ডেরিনকুয়ুকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত তথ্যগুলোর একটি এর সম্ভাব্য ধারণক্ষমতা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়, বিপদের সময় এই ভূগর্ভস্থ নগরীতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারত।
তবে এই সংখ্যাকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক জনসংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। এটি নগরীটির সম্ভাব্য আশ্রয়দানের সক্ষমতা সম্পর্কে একটি প্রচলিত অনুমান। প্রাচীনকালে বহিরাগত আক্রমণ কিংবা নিরাপত্তাহীনতার সময় স্থানীয় বাসিন্দারা ভূগর্ভস্থ আশ্রয় ব্যবহার করতেন বলে ধারণা করা হয়। তাঁরা শুধু নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য নিচে নামতেন না। সঙ্গে নিয়ে যেতেন খাদ্যসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থাও ছিল সেখানে।
ফলে ডেরিনকুয়ু ছিল শুধু আত্মগোপনের জায়গা নয়; বরং বিপদের সময় একটি জনপদকে কিছু সময়ের জন্য সচল রাখার পরিকল্পিত আশ্রয়স্থল।

রান্নাঘর থেকে গির্জা—মাটির নিচে ছিল জীবনযাপনের আয়োজন
ডেরিনকুয়ুর ভেতরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, এর নির্মাতারা মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন। এখানে ছিল বসবাসের কক্ষ, রান্নার জায়গা, খাদ্যশস্য রাখার গুদাম, গবাদিপশুর আস্তাবল এবং আঙুর প্রক্রিয়াজাত করার স্থান। পাশাপাশি ছিল ধর্মীয় উপাসনার ব্যবস্থাও।
তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর দ্বিতীয় স্তরে একটি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। গভীর অংশে পাওয়া গেছে ক্রুশাকৃতির পরিকল্পনায় নির্মিত একটি গির্জা। অর্থাৎ, মাটির নিচের এই স্থাপনা কেবল কয়েকটি অন্ধকার কক্ষের সমষ্টি ছিল না। সেখানে মানুষের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় নানা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।
আজকের দিনে একটি শহর সচল রাখতে যেমন খাদ্য, পানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়, প্রাচীন ডেরিনকুয়ুর নির্মাতারাও তাঁদের সময়ের প্রযুক্তি দিয়ে সেই প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন।
সূর্যের আলো নেই, তবু শ্বাস নিত মানুষ কীভাবে?
ডেরিনকুয়ুর সবচেয়ে বড় প্রকৌশলগত বিস্ময় সম্ভবত এর বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা। মাটির এত গভীরে পর্যাপ্ত বাতাস ছাড়া মানুষের অবস্থান করা সম্ভব নয়। অথচ প্রাচীনকালে সেখানে বৈদ্যুতিক পাখা, আধুনিক ভেন্টিলেশন কিংবা যান্ত্রিক অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না।
তাহলে মানুষ শ্বাস নিত কীভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে নগরীর নির্মাণকৌশলে।
ডেরিনকুয়ুর বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে যুক্ত ছিল উল্লম্ব বায়ু চলাচলের পথ। এসব পথ দিয়ে বাইরের বাতাস ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলোতে পৌঁছাতে পারত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে প্রায় ৫৫ মিটার গভীর একটি বায়ু চলাচলের পথ রয়েছে, যা পানির কূপ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে পানির ব্যবস্থা ছিল। এই পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায়, নির্মাতারা শুধু মাটির নিচে ঘর তৈরি করেননি; সেখানে মানুষের অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির কথাও ভেবেছিলেন।

শত্রুর সামনে বন্ধ হয়ে যেত বিশাল পাথরের দরজা
ডেরিনকুয়ুর আরেকটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। নগরীর বিভিন্ন সুড়ঙ্গে রয়েছে বিশাল গোলাকার পাথরের দরজা। দেখতে অনেকটা পাথরের তৈরি চাকার মতো। বিপদের সময় এসব দরজা গড়িয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ বন্ধ করা যেত। দরজাগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছিল, যাতে ভেতর থেকে বন্ধ করার পর বাইরে থেকে সহজে সরানো কঠিন হয়।
এ ছাড়া নগরীর অনেক সুড়ঙ্গ অত্যন্ত সরু। ফলে আক্রমণকারীদের পক্ষে একসঙ্গে অনেক মানুষ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ত। এই ব্যবস্থা ছিল প্রাচীন মানুষের প্রতিরক্ষামূলক স্থাপত্যের এক অসাধারণ উদাহরণ।
ভাবুন, বাইরে শত্রুর আক্রমণ চলছে। আর মাটির নিচে আশ্রয় নেওয়া মানুষ বিশাল পাথরের দরজা বন্ধ করে নিজেদের নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে। ডেরিনকুয়ুর অন্ধকার সুড়ঙ্গগুলো যেন আজও সেই সময়ের আতঙ্ক ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের স্মৃতি বহন করছে।

কেন মানুষ মাটির নিচে শহর তৈরি করেছিল?
ডেরিনকুয়ুর ইতিহাসের সব প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কারা প্রথম এর নির্মাণ শুরু করেছিল, কোন সময়ে প্রথম কক্ষগুলো তৈরি হয়েছিল এবং কীভাবে বিভিন্ন যুগে এর সম্প্রসারণ ঘটেছিল—এসব বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
তবে কাপ্পাদোকিয়া অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি এ ধরনের স্থাপনা তৈরির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী ছিল।
এ অঞ্চলে আগ্নেয়গিরির ছাই জমে তৈরি হয়েছে তুলনামূলক নরম এক ধরনের শিলা, যাকে বলা হয় ভলকানিক টাফ। এই শিলা সাধারণ পাথরের তুলনায় সহজে কাটা যায়। ফলে প্রাচীন মানুষ হাতের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পাহাড়ের গায়ে ঘর এবং মাটির নিচে সুড়ঙ্গ ও কক্ষ তৈরি করতে পেরেছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংঘাত ও আক্রমণের সময় ভূগর্ভস্থ আশ্রয়স্থলগুলোর গুরুত্ব বাড়ে। বিশেষ করে বাইজেন্টাইন যুগে খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর মানুষ এসব স্থাপনা ব্যবহার করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
ইউনেস্কোর তথ্যেও কাপ্পাদোকিয়ার ভূগর্ভস্থ বসতিগুলোর সঙ্গে বহিরাগত আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার ইতিহাসের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
অর্থাৎ, ডেরিনকুয়ু কোনো রহস্যময় অলৌকিক নির্মাণ নয়; বরং ভূপ্রকৃতি, মানুষের প্রয়োজন, নিরাপত্তা এবং বহু প্রজন্মের শ্রমের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক অসাধারণ স্থাপত্য।
আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই এমন নির্মাণ কীভাবে সম্ভব?
আজ একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করতে প্রয়োজন হয় প্রকৌশলী, নকশা, ভারী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত নির্মাণসামগ্রী। অথচ ডেরিনকুয়ুর নির্মাতাদের হাতে এসব আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। তাঁরা শিলা কেটে তৈরি করেছিলেন একের পর এক কক্ষ। সেই কক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন সুড়ঙ্গের মাধ্যমে। পাশাপাশি রেখেছিলেন বাতাস, পানি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
গবেষকদের ধারণা, নগরীটি একবারে নির্মিত হয়নি। বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী এর সম্প্রসারণ ঘটেছে।
তাই ডেরিনকুয়ুকে কোনো এক ব্যক্তির কীর্তি হিসেবে নয়, বরং বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও সম্মিলিত শ্রমের ফল হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত। এই নগরী মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকলেও মানুষের পরিকল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা কত দূর যেতে পারে।
ডেরিনকুয়ুই কি পৃথিবীর একমাত্র ভূগর্ভস্থ শহর?
না। তুরস্কের কাপ্পাদোকিয়া অঞ্চলে এমন আরও অনেক ভূগর্ভস্থ বসতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কায়মাকলি (Kaymaklı)। সেখানেও বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত কক্ষ, সুড়ঙ্গ, খাদ্য সংরক্ষণের স্থান ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। কাপ্পাদোকিয়ায় ছোট-বড় বহু ভূগর্ভস্থ বসতির সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে সবগুলোর আকার ও গঠন এক নয়।
ডেরিনকুয়ু বিশেষভাবে পরিচিত এর গভীরতা, বিস্তৃত কাঠামো এবং জটিল স্থাপত্যের জন্য। এই অঞ্চলের প্রাচীন শিলাখোদাই স্থাপনা ও ভূগর্ভস্থ জনপদগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো ‘Göreme National Park and the Rock Sites of Cappadocia’ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই ঐতিহ্যবাহী অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর মধ্যে ডেরিনকুয়ুও রয়েছে।
আজও কি মাটির নিচের সেই শহরে মানুষ থাকে?
বর্তমানে ডেরিনকুয়ুর প্রাচীন ভূগর্ভস্থ নগরীতে নিয়মিত জনবসতি নেই। এটি এখন তুরস্কের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনকেন্দ্র। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা এখানে আসেন প্রাচীন মানুষের নির্মাণকৌশল দেখতে এবং অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়ের অভিজ্ঞতা নিতে।
তবে পুরো নগরী পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত নয়। নিরাপত্তা ও প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের কারণে নির্দিষ্ট অংশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, নগরীটির প্রায় ১০ শতাংশ অংশ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। বাকি অংশ এখনও সাধারণ পর্যটকদের নাগালের বাইরে।

মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা মানুষের অসাধারণ ইতিহাস
মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে আমরা সাধারণত উঁচু স্থাপনার কথা বেশি শুনি। মিসরের পিরামিড, রোমের কলোসিয়াম কিংবা আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন—সবই মানুষের নির্মাণক্ষমতার পরিচয় বহন করে। কিন্তু ডেরিনকুয়ু যেন সেই ইতিহাসের এক বিপরীত অধ্যায়।
এখানে মানুষ আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টা করেনি। বরং নিরাপত্তার খোঁজে নেমেছিল মাটির গভীরে। অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতরে তৈরি করেছিল আশ্রয়, খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা, উপাসনালয় এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
আজ সেই কক্ষগুলোতে প্রাচীন বাসিন্দাদের পদচারণা নেই। নেই রান্নার ধোঁয়া কিংবা দৈনন্দিন জীবনের কোলাহল। তবু পাথরের দেয়াল, সরু পথ এবং বিশাল গোলাকার দরজাগুলো যেন নীরবে বলে যায় মানুষের টিকে থাকার গল্প।
ডেরিনকুয়ু তাই শুধু মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা একটি শহর নয়; এটি মানুষের বুদ্ধিমত্তা, ভয়, সংগ্রাম এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছার এক বিস্ময়কর স্মারক।
আর এই শহর আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক অদ্ভুত সত্য—মানবসভ্যতার সব বিস্ময় আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায় না; কিছু বিস্ময় খুঁজতে হয় পায়ের নিচের অন্ধকারেও।
সূত্র: তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ইউনেস্কো
বাপ্পি/সা.এ
মন্তব্য
0 টি মন্তব্য