
ঘোষণাতেই আটকে আছে বরিশালের ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল!
দেশের বানী | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট : দক্ষিণাঞ্চলের শিশুদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বরিশালের আমানতগঞ্জে নির্মাণ করা হয়েছে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল। প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটির ভবনের কাজ শেষ হয়েছে চার বছর আগে। অথচ এখনো শুরু হয়নি চিকিৎসাসেবা। সরঞ্জাম স্থাপন, ভবন হস্তান্তর এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগসহ একাধিক প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে হাসপাতালটির কার্যক্রম।
হাসপাতালটি চালুর বিষয়ে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত কয়েক দফায় সময় ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অক্টোবরে হাসপাতালটি উদ্বোধনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু অক্টোবর পেরিয়ে গেলেও চালুর দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের শিশুদের জন্য নির্মিত এই বিশেষায়িত হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কবে নাগাদ শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর ১১ মে বরিশাল সফরে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ১ আগস্টের মধ্যে হাসপাতালটি চালুর ঘোষণা দেন। এর আগে ২ জুন হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারও আগস্টের মধ্যে চালুর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন।
সর্বশেষ গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নবনির্মিত ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরিশালসহ দেশের পাঁচটি শিশু হাসপাতাল অক্টোবরে একযোগে উদ্বোধনের সম্ভাবনার কথা বলেন। তবে ঘোষিত সময় পার হলেও হাসপাতালটির উদ্বোধন কিংবা চিকিৎসাসেবা শুরুর বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি।
চার বছর আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও মেলেনি সমাধান!
নগরীর আমানতগঞ্জ এলাকায় দুই একর জমির ওপর প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা শেষ হয় ২০২২ সালে।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ভবনটি কোন দপ্তর বা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতাকে হস্তান্তর প্রক্রিয়ার অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট পরিচালক মো. আকেদ হোসেন বলেন, ২০২২ সালে হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এরপর ভবন হস্তান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভবনটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক, সিভিল সার্জন নাকি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ কারণে ভবন হস্তান্তর করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প পরিচালকসহ স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও এ সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়নি।
বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম বলেন, হাসপাতালের আসবাবপত্রের বিভিন্ন সামগ্রী আসছে। বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজ শেষ হয়েছে। শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) স্থাপনের কাজ চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এসি সরবরাহ ও স্থাপনের কাজ শেষ হলে তাঁদের দায়িত্বের বাকি কাজও সম্পন্ন হবে।
১ হাজার ৪৪০ পদ অনুমোদিত, নিয়োগে প্রশাসনিক জটিলতা
হাসপাতালটির কার্যক্রম চালুর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের জন্য ১ হাজার ৪৪০টি পদের জনবল কাঠামো স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয় অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ক্যাডার পদ ৭১৫টি এবং নন-ক্যাডার পদ ৭২৫টি। পদগুলোর মধ্যে উপপরিচালক, জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ পরামর্শক এবং জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পদ রয়েছে।
তবে জনবল কাঠামো অনুমোদিত হলেও জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ কিংবা নিয়োগ কার্যক্রম শুরুর নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জনবল নিয়োগের আগে তিনটি প্রধান মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক প্রশাসনিক অনুমোদন নিতে হবে। এরপর প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশ এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।
তাঁদের মতে, এত বড় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামী ছয় মাসের মধ্যে হাসপাতালটি চালু করার সম্ভাবনা তাঁরা দেখছেন না।
দ্রুত চালুর আশ্বাস স্বাস্থ্য পরিচালকের
হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিবের নির্দেশনায় হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ভবনের কাজ শেষ হয়েছে এবং আসবাবপত্রও এসেছে। নার্স, আনসার ও অন্যান্য কর্মীর পদ সৃজন হয়েছে। জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। হাসপাতালটির কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে বলে আশা করছেন তিনি।
তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে প্রস্তুতির অগ্রগতির কথা উঠে এলেও ভবন হস্তান্তর, সরঞ্জাম স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের কাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো স্পষ্ট নয়।
দক্ষিণাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক শিশুর বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন বিবেচনায় বরিশালের এই হাসপাতালটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত। হাসপাতালটি চালু হলে শিশুদের জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র ছুটতে হওয়ার চাপ কমবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও অব্যবহৃত পড়ে থাকা এই হাসপাতাল কবে চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
মন্তব্য
0 টি মন্তব্য