জেলার খবর

কালীগঞ্জের খরায় ব্যতিক্রমী এক সাফল্যের গল্প

প্রকাশিত :
রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬
/
৩ বার সংবাদটি দেখেছে

গাজীপুরের কালীগঞ্জে এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক, আলিম ও সমমানের পরীক্ষায় যেন খরা নেমেছে। পুরো উপজেলায় পাসের হার মাত্র ৫০ শতাংশ। কলেজগুলোতে সামান্য জিপিএ-৫ এর দেখা মিললেও মাদ্রাসা পর্যায়ে তা প্রায় শূন্যের কোঠায়। উপজেলার কোনো মাদ্রাসা থেকেই এবার কেউ জিপিএ-৫ অর্জন করতে পারেনি।

এমন এক নিরাশার চিত্র যখন পুরো উপজেলাজুড়ে, ঠিক তখনই সব অন্ধকার ভেদ করে সাফল্যের প্রদীপ জ্বেলেছে একটি প্রত্যন্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী—সানজিদা নাহার সামিয়া। সে জামালপুর ইউনিয়নের চুপাইর জামিউল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী হিসেবে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে পুরো উপজেলায় তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বাহ্যিক চাকচিক্য বা আধুনিক অবকাঠামো বলতে যা বোঝায়, তার বিন্দুমাত্র নেই এই মাদ্রাসায়। চারদিকে ভাঙা টিনশেড ঘর আর মাত্র দুই কক্ষ বিশিষ্ট একটি দোতলা ভবনই এই প্রতিষ্ঠানের মূল অবকাঠামো। সম্প্রতি আরও একটি একতলা ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। উপজেলার অন্য সব স্কুল-মাদ্রাসা যখন বহুতল ভবনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে, তখন এই মাদ্রাসাটি যেন চরম অবহেলায় নিমজ্জিত। কিন্তু শত প্রতিকূলতা ও অবকাঠামোগত সংকটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই মাদ্রাসা থেকে এবার ৭৭.৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, যা এককথায় অভাবনীয়।

মাদ্রাসার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা ও কঠোর নজরদারি। প্রতিষ্ঠানটির সদ্য বিদায়ী পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মাহমুদুল হাসানের নেওয়া কিছু যুগোপযোগী পদক্ষেপ পুরো চিত্রটাই বদলে দিয়েছে। শিক্ষকবৃন্দের মতে, সভাপতির নেওয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে ছিল—প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ক্লাসের পড়া ক্লাসেই আদায় করা, ডায়রি মেইনটেইন করা, প্রতিষ্ঠানকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা, আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক করা, নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেওয়া।

সাফল্যের এই পেছনের গল্প নিয়ে কথা হয় মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল আবদুল্লাহ আল মামুনের সাথে। তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “উপজেলার সব মাদ্রাসায় যখন ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে, তখন আমাদের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানটি ৭৭.৭৭ শতাংশ পাস ও গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। আমাদের অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে, কিন্তু সদিচ্ছা, শৃঙ্খলা এবং সাবেক সভাপতি মহোদয়ের কিছু দূরদর্শী পদক্ষেপ আমাদের এই অনন্য সাফল্য এনে দিয়েছে।”

সদ্য বিদায়ী পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মাহমুদুল হাসান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষার মানোন্নয়নে কিছু কঠোর নিয়ম চালু করি। নিয়মিত হাজিরা, অভিভাবক সম্পৃক্ততা এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতায় আজ আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছে যে সুযোগের অভাব মেধাকে আটকে রাখতে পারে না। আমরা চাই দ্রুত এই মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নয়নে সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসবেন।”

এই সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে বড় রত্নটি যুক্ত করেছে সানজিদা নাহার সামিয়া। যেখানে উপজেলার কোনো মাদ্রাসা থেকে কেউ জিপিএ-৫ পেল না, সেখানে সানজিদার এই অর্জন তাকে এনে দিয়েছে অনন্য খ্যাতি। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সানজিদা বলে, “মাদ্রাসার পড়াশোনার পরিবেশ এবং শিক্ষকদের নিরলস সহযোগিতাই আমার এই সাফল্যের চাবিকাঠি। আমি প্রতিদিন নিয়ম করে ৪-৫ ঘণ্টা নিয়মিত পড়াশোনা করতাম। এক্ষেত্রে আমার মাদ্রাসার শিক্ষক এবং পরিবারের অভিভাবকরা সবসময় আমাকে সাহস ও সহযোগিতা জুগিয়েছেন।”

অভাব, ভাঙা টিনশেড ঘর আর প্রতিকূল পরিবেশেও যে মেধার আলো ছড়ানো যায়, চুপাইর জামিউল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসা ও সানজিদা নাহার সামিয়া সেটি প্রমাণ করে দেখালেন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো সাফল্য উপহার দেবে।



স্বাধীন/সা.এ.

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *