
জাপানে স্থায়ী বসবাসে কঠোর নিয়ম, অনিশ্চয়তায় বিদেশিরা
জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চান এমন বিদেশিদের জন্য নিয়ম আরও কঠোর করছে দেশটির সরকার। নতুন ব্যবস্থায় পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির (পিআর) আবেদনকারীদের আয়, জাপানি ভাষাজ্ঞান ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলোতে বাড়তি শর্ত পূরণ করতে হবে। এতে দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাস করা অনেক বিদেশির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম আগামী ১ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। নতুন শর্ত অনুযায়ী, পিআরের আবেদনকারীর পরিবারের বার্ষিক আয় জাপানের গড় আয়ের চেয়ে বেশি হতে হবে। এপ্রিল থেকে জমা দেওয়া কিছু আবেদনের ক্ষেত্রেও এ শর্ত প্রযোজ্য হবে।
এ ছাড়া আবেদনকারীদের জাপানি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। অবসরকালীন পেনশনের জন্য ৩০ বছরের সমপরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
জাপানের ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটিতে বসবাসরত বিদেশিদের নিজেদের জীবনযাপনের ব্যয় বহনে সক্ষম হতে হবে। একই সঙ্গে তাদের এমন আর্থিক অবস্থায় থাকতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি না থাকে।
নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্নদের মধ্যে রয়েছেন জাপানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা বিদেশিরাও। তাদের একজন বাংলাদেশের নাগরিক আবদুল। প্রায় আট বছর ধরে জাপানে কাজ করছেন এই প্রযুক্তি প্রকৌশলী। উত্তর টোকিওতে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করা আবদুল স্থায়ী বসবাসের পাশাপাশি জাপানের নাগরিকত্বের জন্যও আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে জাপান সরকার নিয়ম আরও কঠোর করবে কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। পিআর ও নাগরিকত্বের আবেদন—দুটিই প্রত্যাখ্যাত হলে জাপান ছেড়ে অন্য দেশে সুযোগ খোঁজার কথাও ভাবছেন তিনি।
জাপানে ১৪ বছর ধরে বসবাস করা মার্কিন নাগরিক সারাহ নেলকিনও নতুন নিয়ম নিয়ে চিন্তিত। বিনোদন শিল্পে কর্মরত নেলকিন নিয়ম পরিবর্তনের ঘোষণা আসার কিছুদিন আগে স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করেছিলেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাপানের নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। তবে জাপান দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি না দেওয়ায় নাগরিকত্ব পেতে হলে তাকে মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে হতে পারে।

জাপানে জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে কর্মক্ষম জনসংখ্যা দ্রুত কমছে। বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি পূরণে বিদেশি কর্মীদের ওপর দেশটির নির্ভরতা বাড়ছে। তবে একই সময়ে বিদেশিদের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর করা হচ্ছে।
মেইকাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিসা হাগিওয়ারার মতে, জাপানের শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের শর্ত কঠিন হয়ে গেলে কাজের জন্য জাপানকে বেছে নেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বেড়ে রেকর্ড ৪১ লাখ ২০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ এখন বিদেশি।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে জাপানি নাগরিকের সংখ্যা ৯ লাখের বেশি কমেছে। ফলে জনসংখ্যা সংকট ও শ্রমিকের ঘাটতির মধ্যেই বিদেশিদের নিয়ে জাপানের নীতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিদেশিদের নিয়ে জাপানের জনমতেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের এক জরিপে ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ জাপানি নাগরিক জানিয়েছেন, তারা আরও বেশি বিদেশি গ্রহণের বিরোধী। ২০২৪ সালে একই মত পোষণ করেছিলেন ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
জাপানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা কয়েকজন বিদেশিও সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন ও সামাজিক পরিসরে বিদেশিদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বাড়ার কথা জানিয়েছেন।
জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্যও নতুন নিয়ম বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আয়, জাপানি ভাষায় দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতার মতো শর্ত পূরণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন পাওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন জাপানে কাজ করছেন কিন্তু আয় বা আর্থিক সঞ্চয় নতুন মানদণ্ড পূরণ করছে না—এমন বাংলাদেশিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে জাপান এখন এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি—শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় দেশটির বিদেশি কর্মী প্রয়োজন, আবার দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের ক্ষেত্রে তাদের জন্য বাড়ছে শর্ত ও কড়াকড়ি। ফলে জাপানে থাকা বিদেশিদের অনেকেই এখন দেশটিতে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাপ্পি/সা.এ
মন্তব্য
0 টি মন্তব্য