সারাবিশ্ব

‘আসামে আসুন, ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ পাঠাব’- রাহুলকে হিমন্তের হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত :
সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
/
২ বার সংবাদটি দেখেছে

ভারতের রাজনীতিতে বাংলাদেশ আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। এবার দেশটির লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তাঁর মন্তব্য, ‘রাহুলজি, আসামে আসুন, আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেব।’ শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের প্রতি রাহুল গান্ধীর এত দরদ থাকলে তাঁকে সেখানে গিয়ে নির্বাচন করার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

রবিবার (১ নভেম্বর) হিমাচল প্রদেশের শিমলায় বিজেপির এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেওয়া হিমন্তের এই বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে এটি নিছক দুই নেতার বাক্যযুদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে ভারতের অনুপ্রবেশ বিতর্ক, নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা সংশোধন, সীমান্ত রাজনীতির দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এবং আসন্ন রাজনৈতিক সমীকরণ।

ঘটনার সূত্রপাত দিল্লিতে বিরোধী জোটের সমাবেশকে কেন্দ্র করে। একই দিনে দিল্লির রামলীলা ময়দানে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হন রাহুল গান্ধী। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে তিনি অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, ভোট চুরির সঙ্গে জড়িতদের একদিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এমনকি জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরিয়ে কারাগারে পাঠানোর কথাও বলেন তিনি।

রাহুলের এই বক্তব্যের পরই বিজেপির পক্ষ থেকে পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু হয়। শিমলায় দলীয় কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা তাঁকে সরাসরি নিশানা করেন।

হিমন্ত বিশ্বশর্মা তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশিদের প্রতি রাহুল গান্ধীর এত দরদ থাকলে তাঁর বাংলাদেশে গিয়ে নির্বাচন করা উচিত। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশিদের এখানে কোনো জায়গা নেই। রাহুলজি, বাংলাদেশিদের প্রতি আপনার যদি এতই দরদ থাকে, তাহলে বাংলাদেশে যান। সেখানে গিয়ে নির্বাচন লড়ুন।’

এমনকি রাহুল গান্ধীকে আসামে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে হিমন্ত বলেন, তিনি এবং পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী মিলে রাহুলের বাংলাদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন। এ বিষয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর এই বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা। হিমন্তের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন রাহুল। তাঁর দাবি, কংগ্রেসের এই অবস্থান অনুপ্রবেশকারীদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা।

হিমন্তের বক্তব্য বুঝতে হলে আসামের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই রাজ্যে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের বিষয়।

১৯৭৯ সালে আসামে বিদেশি নাগরিক শনাক্ত ও বহিষ্কারের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নসহ (আসু) বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে চলা এই আন্দোলন প্রায় ছয় বছর স্থায়ী হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার, আসাম সরকার এবং আন্দোলনকারী নেতাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘আসাম চুক্তি’।

চুক্তিতে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই তারিখের পর আসামে আসা বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

এই চুক্তির ধারাবাহিকতায় আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন বা এনআরসি (NRC) হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় প্রায় ৩ কোটি ১১ লাখ মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। বাদ পড়েন প্রায় ১৯ লাখ মানুষ।

তবে এনআরসির তালিকায় নাম না থাকা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক—এমন নয়। তাঁদের নাগরিকত্বের দাবি যাচাই ও আপিলের জন্য আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। ফলে নাগরিকত্বের প্রশ্নটি এখনো আসামের রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল।

বর্তমান রাজনৈতিক উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় প্রক্রিয়া বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR)। নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের নামও বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন পক্ষের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া, দ্বৈত ও অযোগ্য ভোটারের নাম বাদ দিতেই এই উদ্যোগ।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের আশঙ্কা, এতে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, তালিকার ভুল ও অনুপযুক্ত নাম সংশোধন করাই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য।

রাহুল গান্ধী এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকায় কারসাজির মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। রোববার দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের সমাবেশেও তিনি একই অভিযোগ তোলেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে তাঁকে ভবিষ্যতে বিচারের মুখোমুখি করার হুঁশিয়ারি দেন।

শিমলার বিজেপির কর্মসূচিতে হিমন্ত বিশ্বশর্মা শুধু বাংলাদেশ প্রসঙ্গেই রাহুলকে আক্রমণ করেননি, কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও কটাক্ষ করেছেন।

তিনি দাবি করেন, কংগ্রেস আর কখনো ভারতের ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। তাঁর বক্তব্য, ভারতে সরকার পরিবর্তন হয় জনগণের ভোটে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) কিংবা ব্যালট পেপার—কোনো পদ্ধতিতেই কংগ্রেসের পরাজয় ঠেকানো যাচ্ছে না।

হিমন্তের ভাষ্য, বিজেপি ভোট চুরি করে না, বরং মানুষের মন জয় করে। একই সঙ্গে তিনি কংগ্রেসকে নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য ভোটিং পদ্ধতিকে দায়ী না করে নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা পর্যালোচনার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের পেছনে রয়েছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন। ফলে দুই নেতার এই বাক্যযুদ্ধ ভারতের ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতেরই অংশ।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের বিষয়টি বহু বছর ধরে নির্বাচনী বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে অনুপ্রবেশের অভিযোগ, নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—তিনটি পৃথক বিষয়। কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্য প্রযোজ্য আইন ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য তাই শুধু রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ করে দেওয়া একটি রাজনৈতিক কটাক্ষ নয়; এর মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে ভারতের নাগরিকত্ব, অনুপ্রবেশ ও ভোটার তালিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ তৈরির প্রবণতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

রাহুল গান্ধী ও হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর বিতর্ক কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।



বাপ্পি/সা.এ

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *