
সেতুর মাধ্যমে বরিশালের সঙ্গে ভোলাকে যুক্ত করার দাবি
দেশের বানী | স্টাফ করেসপন্ডেন্ট : সড়ক নয়, সেতুর মাধ্যমে বরিশালের সঙ্গে ভোলাকে সরাসরি যুক্ত করার দাবি জানিয়েছে ‘আমরা ভোলাবাসী’ সংগঠন। এ দাবিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা পথে মহাসড়ক নির্মাণে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের যে হিসাব প্রকাশ্যে এসেছে, সেটিও পূর্ণাঙ্গ নয় বলে দাবি করেছে ‘আমরা ভোলাবাসী’। সংগঠনটির মতে, দীর্ঘ নদীপথে সেতু ও ভায়াডাক্ট, নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ, অ্যাপ্রোচ সড়কসহ প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামোর ব্যয় যুক্ত হলে প্রকল্পের মোট ব্যয় আরও অনেক বেশি হতে পারে।
সোমবার জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির নেতারা জানান, স্পিকার স্মারকলিপিটি আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিয়েছেন।
‘আমরা ভোলাবাসী’র দাবি, ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থায়ী সড়ক যোগাযোগে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো পক্ষের আপত্তি নেই। দীর্ঘদিন ধরেই ভোলার সঙ্গে স্থায়ী সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার দাবি রয়েছে। তবে তাদের প্রশ্ন—কোন পথে এই সংযোগ তৈরি হলে রাষ্ট্রের বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও যোগাযোগগত সুফল পাওয়া যাবে।
আরও পড়ুন : হাফিজ উদ্দিন আহমেদ: জীবনী, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক জীবন
সংগঠনটির বক্তব্য, রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা পথে মহাসড়ক নির্মাণে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের যে হিসাব প্রকাশ্যে এসেছে, সেখানে দীর্ঘ নদী পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় সেতু ও ভায়াডাক্ট, নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ, অ্যাপ্রোচ, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, কালভার্ট ও ড্রেনেজসহ প্রকল্পের সব ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
গত ২২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিকল্প মহাসড়কের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। পরে রহমতপুর–হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ–ভোলা পথে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ পথের সুবিধা হিসেবে দূরত্ব, সময় ও পরিবহন ব্যয় কমার কথা বলা হয়েছে। ৩০ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মেহেন্দিগঞ্জ–মুলাদী–রহমতপুর মহাসড়ক নির্মাণে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্যও প্রকাশ করা হয়।
‘আমরা ভোলাবাসী’র মতে, কোনো প্রকল্পের প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় কম দেখালেই সেটিকে কম ব্যয়ের প্রকল্প বলা যায় না। বিশেষ করে নদীবহুল দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক নির্মাণের সঙ্গে সেতু, ভায়াডাক্ট, অ্যাপ্রোচ সড়ক, নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ, ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, কালভার্ট ও ড্রেনেজসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।
এ ক্ষেত্রে মীরগঞ্জ সেতুকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছে সংগঠনটি। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মীরগঞ্জ সেতু ও ভায়াডাক্টের মোট দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৪৮৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল সেতু ৫৪৪ মিটার এবং ভায়াডাক্ট ৯৪০ মিটার। প্রায় ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়কসহ প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
সংগঠনটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ইলিশা–মেহেন্দিগঞ্জ অংশে প্রায় ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার এবং মেহেন্দিগঞ্জ–হিজলা অংশে প্রায় ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার সেতু ও ভায়াডাক্ট প্রয়োজন হতে পারে। প্রায় ৯ কিলোমিটার সেতু ও সংশ্লিষ্ট নদীশাসনেই প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে বলে তাদের ধারণা। এর সঙ্গে নতুন মহাসড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, অ্যাপ্রোচ, কালভার্ট, ছোট-বড় সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যয় যুক্ত হলে মোট ব্যয় ১৫ হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে বলে সংগঠনটি প্রাথমিকভাবে অনুমান করেছে।
তাদের দাবি, সেতুর পরিবর্তে সড়কপথের সমীক্ষায় যাওয়ার আগে উভয় বিকল্পের প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ ব্যয় একই মানদণ্ডে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মাণের সম্ভাবনাও বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
‘আমরা ভোলাবাসী’র মতে, ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মিত হলে শুধু যাতায়াতের সময়ই কমবে না; যানবাহনের পরিচালন ব্যয়, জ্বালানি খরচ ও পণ্য পরিবহনের সময়ও কমতে পারে। এতে ভোলার কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্য দ্রুত বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে। শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য মানুষের চলাচল সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
সংগঠনটি আরও মনে করে, ভোলা–বরিশাল সেতুর গুরুত্ব শুধু দুই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে এটি চট্টগ্রাম–কুমিল্লা–লক্ষ্মীপুর–ভোলা–বরিশাল–খুলনা–যশোর অঞ্চলের মধ্যে একটি আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগ করিডোর তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।
স্মারকলিপিতে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির ক্ষেত্রে তথ্যের পূর্ণাঙ্গতা ও যাচাইযোগ্যতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পের প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় প্রকৌশলগত ও আর্থিক সব উপাদান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
তবে কোনো কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন করেছেন বা ব্যয় কম দেখিয়েছেন—এমন অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে না দেখে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তদন্তে ইচ্ছাকৃত তথ্য গোপন, গুরুতর তথ্যগত অসঙ্গতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে তারা।
সংগঠনটির মতে, ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত কেবল একটি আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্পের বিষয় নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যৎ আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত। তাই শুধু প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় নয়, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ জীবনকালীন ব্যয়, অর্থনৈতিক সুফল ও দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগগত গুরুত্ব বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
মন্তব্য
0 টি মন্তব্য