বিনোদন

১৩ হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়েছেন শাহরুখ

প্রকাশিত :
সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
/
৪ বার সংবাদটি দেখেছে

টেলিভিশনের অভিনেতা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু। এরপর সিনেমা, প্রযোজনা, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (ভিএফএক্স), ক্রিকেট, বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে একের পর এক পদক্ষেপে নিজের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বলিউডের বাদশাহ শাহরুখ খান। হুরুন ইন্ডিয়ার ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি রুপি, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু কীভাবে অভিনয় থেকে ব্যবসায় বিস্তৃত হয়ে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন এই অভিনেতা?

শাহরুখ খানের পরিচয় এখন আর শুধু অভিনেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি প্রযোজক, ব্যবসায়ী, ক্রিকেট দলের মালিক এবং বিনোদনশিল্পের একজন উদ্যোক্তা। পর্দায় অভিনয় দিয়ে দর্শকের মন জয় করার পাশাপাশি পর্দার বাইরেও নিজের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তৈরি করেছেন আলাদা অবস্থান। তবে তাঁর এই যাত্রার শুরুটা ছিল একেবারেই সাধারণ।

১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর দিল্লিতে জন্ম শাহরুখের। বাবা মীর তাজ মোহাম্মদ খান ছিলেন ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী, মা লতিফ ফাতিমা ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। দিল্লির সেন্ট কলম্বাস স্কুলে পড়াশোনা শেষে হংসরাজ কলেজে ভর্তি হন তিনি। পরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও অভিনয়ের টানে তা শেষ করেননি। থিয়েটার ও টেলিভিশনে কাজ করতে করতেই বড় পর্দায় যাওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয় তাঁর।

১৯৯১ সালে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান শাহরুখ। পরের বছর ‘দিওয়ানা’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় পরিচিতি পান। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, একদিন এই অভিনেতাই হয়ে উঠবেন বিশ্বের অন্যতম ধনী অভিনয়শিল্পীদের একজন।

সিনেমার পারিশ্রমিক থেকে ব্যবসার মালিকানা

শাহরুখের সম্পদ গড়ার প্রথম বড় ভিত্তি অভিনয়। নব্বইয়ের দশকে ‘বাজিগর’, ‘ডর’, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ও ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে তারকাখ্যাতি পান তিনি। একের পর এক সফল ছবির সুবাদে বাড়তে থাকে তাঁর পারিশ্রমিক। তবে শুধু নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

ক্যারিয়ারের একপর্যায়ে সিনেমার লাভের অংশীদার হওয়ার কৌশলও গ্রহণ করেন শাহরুখ। অর্থাৎ, কোনো সিনেমার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নেওয়ার পাশাপাশি ছবির ব্যবসা ভালো হলে সেখান থেকেও আয়ের সুযোগ তৈরি করেন। ‘পাঠান’ ও ‘জওয়ান’-এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমা তাঁর এই কৌশলের আর্থিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। অভিনয় থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হয় এভাবে।

প্রথম ব্যবসায়িক উদ্যোগে ধাক্কা

শাহরুখের ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্পে শুরুতেই সাফল্য আসেনি। ১৯৯৯ সালে অভিনেত্রী জুহি চাওলা ও পরিচালক আজিজ মির্জার সঙ্গে মিলে গড়ে তোলেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ড্রিমজ আনলিমিটেড। অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমা নির্মাণ ও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়াই ছিল প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য।

প্রতিষ্ঠানটির প্রথম সিনেমা ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ মুক্তি পায় ২০০০ সালে। শাহরুখ ও জুহি অভিনীত ছবিটি বক্স অফিসে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এরপর ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ‘অশোকা’ও ব্যবসায়িকভাবে বড় সাফল্য পায়নি। পরপর দুই ছবির ব্যর্থতায় প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক চাপের মুখে পড়ে। তবে এখানেই থেমে যাননি শাহরুখ। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘চলতে চলতে’ তুলনামূলক ভালো ব্যবসা করে।

রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট: সাম্রাজ্যের ভিত্তি

ড্রিমজ আনলিমিটেডের অভিজ্ঞতার পর শাহরুখ নিজের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে আরও বিস্তৃত করেন। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্ত্রী গৌরী খানও এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ম্যায় হু না’ ছিল প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলোর একটি। এরপর ‘ওম শান্তি ওম’, ‘বিল্লু’, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’, ‘দিলওয়ালে’, ‘রইস’ ও ‘জওয়ান’-এর মতো সিনেমা নির্মাণ ও প্রযোজনায় যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

রেড চিলিজের কার্যক্রম শুধু সিনেমা নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। চলচ্চিত্রের স্বত্ব, পরিবেশনা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও পোস্ট-প্রোডাকশনের কাজেও বিস্তৃত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা। ফলে একটি সিনেমা মুক্তির পরও এর স্বত্ব ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, শাহরুখের সম্পদ তৈরির পেছনে অভিনয়ের পাশাপাশি সিনেমার মালিকানা ও ব্যবসায়িক অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ভিএফএক্স ব্যবসায় বিনিয়োগ

সিনেমার ব্যবসায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস বা ভিএফএক্সে বিনিয়োগ। দর্শক পর্দায় অভিনেতাদের অভিনয় দেখলেও সিনেমা নির্মাণের পেছনে থাকা প্রযুক্তিগত কাজও বড় ব্যবসার ক্ষেত্র। শাহরুখ সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন।

রেড চিলিজের অধীনে গড়ে ওঠে রেড চিলিজ ভিএফএক্স। ‘রা.ওয়ান’, ‘কৃষ থ্রি’, ‘ফ্যান’ ও ‘জিরো’সহ বিভিন্ন সিনেমায় ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সিনেমাতেও কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এখানে শাহরুখের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার একটি দিক স্পষ্ট—তিনি শুধু নিজের অভিনীত সিনেমায় অর্থ বিনিয়োগ করেননি, বরং সিনেমা নির্মাণের প্রযুক্তি ও দক্ষতাকেও ব্যবসার অংশ করেছেন।

ক্রিকেটে বিনিয়োগ, কলকাতা নাইট রাইডার্স

শাহরুখের সম্পদ বৃদ্ধির গল্পে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ক্রিকেট। ২০০৮ সালে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) প্রথম আসরের আগে কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকানায় যুক্ত হন তিনি। জুহি চাওলা ও তাঁর স্বামী জয় মেহতার সঙ্গে মিলে দলটি কেনেন। সে সময় প্রায় ২৬২ কোটি রুপি বিনিয়োগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

শুরুর দিকে কেকেআরের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না। প্রথম তিন আসরে দলটি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তবে বিনিয়োগ থেকে সরে আসেননি শাহরুখ। ২০১২ সালে প্রথমবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয় কলকাতা। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতে দলটি। এরপর ২০২৪ সালেও চ্যাম্পিয়ন হয় কেকেআর।

এর বাইরেও ক্যারিবীয় প্রিমিয়ার লিগের ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেটের লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্সসহ বিভিন্ন ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় নাইট রাইডার্স ব্র্যান্ডের বিস্তার ঘটেছে।

বিজ্ঞাপনেও শাহরুখের আলাদা বাজার

শাহরুখের সম্পদের আরেকটি বড় উৎস বিজ্ঞাপন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্যের দূত হিসেবে কাজ করছেন তিনি। গাড়ি, ঘড়ি, পানীয়, প্রযুক্তিপণ্য, ব্যাংকিং ও টেলিযোগাযোগসহ নানা খাতের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে তাঁকে।

ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর ভক্ত রয়েছে। ফলে বিজ্ঞাপনে তাঁর উপস্থিতি শুধু ভারতীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছায়।

২০২৬ সালে প্রকাশিত ভারতীয় তারকাদের ব্র্যান্ডমূল্যসংক্রান্ত প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, শাহরুখের ব্র্যান্ডমূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৯৪ কোটি রুপি।

মান্নাত থেকে দুবাই, আবাসনেও বিপুল সম্পদ

শাহরুখের সম্পদের আলোচনায় তাঁর আবাসনসম্পত্তির কথাও উঠে আসে। মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘মান্নাত’ শুধু তাঁর বাড়ি নয়, ভক্তদের কাছেও এটি পরিচিত একটি স্থাপনা। একসময় বাড়িটির নাম ছিল ভিলা ভিয়েনা। পরে শাহরুখ এটি কিনে সংস্কার করেন। বাড়িটির অভ্যন্তরীণ নকশায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন স্ত্রী গৌরী খান।

এ ছাড়া দুবাইয়ের পাম জুমেইরায় রয়েছে তাঁর বিলাসবহুল ভিলা। লন্ডন ও ভারতের আলিবাগেও তাঁর সম্পত্তি থাকার খবর বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।

টেলিভিশন থেকে বড় পর্দা, অভিনয় থেকে প্রযোজনা, ভিএফএক্স থেকে ক্রিকেট—শাহরুখ খানের সম্পদ গড়ার পথটি একক কোনো আয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং বিনোদনজগতের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে একাধিক ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং সেসব প্রতিষ্ঠানের বিস্তারের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে তাঁর এই বিশাল সম্পদের সাম্রাজ্য।



স্বাধীন/সা.এ.

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *