জেলার খবর

৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, এবার অনার্সে পড়তে চান শেফালী

প্রকাশিত :
শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
/
৭ বার সংবাদটি দেখেছে

সংসার, সন্তান আর জীবনের নানা দায়িত্বের চাপে একসময় থেমে গিয়েছিল পড়াশোনা। কিন্তু মনের ভেতর লালন করা স্বপ্নটিকে কখনো হারিয়ে যেতে দেননি নীলফামারীর শেফালী বেগম। দীর্ঘ বিরতির পর আবার বই হাতে তুলে নিয়ে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এবার তাঁর স্বপ্ন অনার্সে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কালীগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা শেফালী বেগমের এই অর্জন এখন এলাকায় আলোচনার বিষয়। বয়স কিংবা সংসারের দায়িত্ব যে শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, নিজের সাফল্য দিয়ে সেটিই দেখিয়েছেন তিনি।

শেফালীর জীবনের গল্পটা অবশ্য সহজ ছিল না। মাত্র দেড় বছর বয়সে ফুফাতো ভাই মকছেদুল আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৮৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্বামীর বাড়িতে যাওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। এরপর সংসার ও সন্তানদের লালন-পালনেই কেটে যায় দীর্ঘ সময়। তবে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নটি মনের মধ্যে থেকেই যায়।

শুধু সংসার সামলানো নয়, সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন শেফালী। ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। টানা দুই মেয়াদে ২০২১ সাল পর্যন্ত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২০ সালে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহে আবার পড়াশোনা শুরু করেন শেফালী। ভর্তি হন ডোমার উপজেলার গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে। এরপর ২০২৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এবার এইচএসসিতেও জিপিএ ৪.২১ অর্জন করে নিজের স্বপ্নপূরণের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন।

সংসারের কাজ সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন ছিল, তা জানাতে গিয়ে শেফালী বলেন, ‘সব কাজ শেষ করে রাত ৯টার পর পড়তে বসতাম। কোনো প্রাইভেট শিক্ষক ছিল না। ইংরেজিতে সমস্যা হলে ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে শিখে নিতাম। পড়তে পড়তে কখন যে রাত একটা-দুইটা বেজে যেত, বুঝতেই পারতাম না।’

তিনি বলেন, ‘আমার খুব ইচ্ছা ছিল উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্বামীর বাড়িতে চলে আসায় তা আর সম্ভব হয়নি। এরপর সংসার আর সন্তানদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। সন্তানদের সফলতা আমাকে আবার পড়াশোনার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।’

নিজের অর্জনে আনন্দিত শেফালী আরও বলেন, ‘এই বয়সে এসে অনেকে পারবে কি না জানি না, তবে আল্লাহর রহমতে আমি পেরেছি। বয়স শুধু একটি সংখ্যা। আমি এখানেই থামতে চাই না। এবার অনার্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।’

শেফালীর এই পথচলায় সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে পাশে ছিলেন তাঁর স্বামী ও সন্তানেরা।

স্বামী মকছেদুল আলম বলেন, ‘আমরা সব সময় তাকে উৎসাহ দিয়েছি। বলেছি, ভালো ফল করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই, আগে পাস করো। পড়াশোনা করলে সমাজের জন্যও কিছু করা সম্ভব। সে যেন ঠিকমতো পড়তে পারে, সে জন্য সংসারের কাজেও সহযোগিতা করেছি।’

মায়ের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত বড় ছেলে আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। মায়ের এমন অর্জনে যে আনন্দ পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

জীবনের দীর্ঘ সময় সংসার ও সন্তানদের জন্য ব্যয় করার পর নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে চলেছেন শেফালী বেগম। তাঁর এই সাফল্য মনে করিয়ে দেয়, শেখার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। প্রবল ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম আর পরিবারের সহযোগিতা থাকলে দীর্ঘদিনের অপূর্ণ স্বপ্নও একদিন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।



বাপ্পি/সা.এ

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *