বরিশালবরিশাল জেলাবরিশাল নগরীবরিশাল বিভাগবরিশাল মহানগর

মশারি নেই, পৃথক ওয়ার্ড নেই—বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে সাধারণ রোগীরাও ঝুঁকিতে

প্রকাশিত :
বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬
/
৩৪ বার সংবাদটি দেখেছে

 

বরিশাল প্রতিনিধি:
বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ ছড়িয়ে পড়লেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে তাদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই। এর ওপর অনেক ডেঙ্গু রোগীর শয্যায় নেই মশারি। কেউ বাড়ি থেকে মশারি আনলেও অনেক ক্ষেত্রে তা টাঙানোর ব্যবস্থা নেই। ফলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েও ডেঙ্গু রোগীরা মশার কামড়ের ঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না।

আরও উদ্বেগের বিষয়, একই ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও সাধারণ রোগীদের রাখায় হাসপাতালের ভেতরেই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ ডেঙ্গু মোকাবিলায় হাসপাতালে থাকা মশারি, শয্যা ও ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা নিয়েই দেখা দিয়েছে নানা অসঙ্গতি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৭৯১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১১০ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে একজনের। চলতি বছরে বিভাগে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।

সর্বশেষ ১ সেপ্টেম্বর রাতে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা উত্তম ঘরামী (৫০) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এ পর্যন্ত মৃতদের মধ্যে আটজন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, একজন ঝালকাঠি এবং একজন পিরোজপুর হাসপাতালে মারা গেছেন।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বড় একটি অংশকে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে একই মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা চিকিৎসা পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। অধিকাংশ রোগীর শয্যায় মশারি নেই।

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় মশারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অনেকেই তা পাচ্ছেন না। আবার যাদের নিজস্ব মশারি আছে, তারাও সেটি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায়।

একজন রোগীর জন্য হাসপাতালে থাকার কথা যেখানে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা পরিবেশ, সেখানে ডেঙ্গু রোগীকে একই ওয়ার্ডে মশারি ছাড়া রাখার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে হাসপাতালের রোগী-নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

নেহরাবাদের বাসিন্দা তহমিনা বেগম ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তার অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে কোনো মশারি দেওয়া হয়নি। বাড়ি থেকে মশারি আনা হলেও শয্যার পাশে তা টাঙানোর ব্যবস্থা নেই।

পিরোজপুরের কাঁঠালিয়া থেকে আসা মো. সোহরাবহান গাজীও একই অভিযোগ করেছেন। জ্বর না কমায় উপজেলা হাসপাতাল থেকে তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকেরা মশারি ব্যবহার করতে বললেও হাসপাতালে এসে তিনি মশারি পাননি।

অর্থাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ একদিকে, আর বাস্তব পরিস্থিতি অন্যদিকে।

বাকেরগঞ্জের চিকিৎসাধীন রোগী লাল মিয়া বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে সাধারণ রোগীদের একই জায়গায় রাখা হচ্ছে। তার আশঙ্কা, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মাধ্যমে অন্য রোগীরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের রোগী কবিতা বেগম জানান, তার পাশেই কয়েকজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। একই সঙ্গে ওয়ার্ডে রয়েছে মশার উপদ্রব। ফলে তিনি নিজেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—ডেঙ্গু নিয়েই যখন মানুষ হাসপাতালে আসছেন, তখন হাসপাতালের ভেতরেই যদি রোগীকে মশার কামড় থেকে নিরাপদ রাখা না যায়, তাহলে চিকিৎসাব্যবস্থার প্রকৃত সুরক্ষা কোথায়?

হাসপাতালের দায়িত্বশীল নার্সদের ভাষ্য, হাসপাতালে মশারি আছে। তবে অনেক রোগী মশারি নিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ায় পরে নার্সদের মশারির হিসাব দিতে হয়। এ কারণে মশারি বিতরণে অনীহা তৈরি হয়।

এ ছাড়া অনেক শয্যার পাশে মশারি টাঙানোর পর্যাপ্ত জায়গা বা স্ট্যান্ড নেই বলেও তারা দাবি করেন।

কিন্তু রোগীদের প্রশ্ন, মশারির হিসাব এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার দায় কেন একজন ডেঙ্গু রোগীকে বহন করবেন? রোগীর প্রয়োজন যদি মশারি হয়, তাহলে সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলার মধ্যে পিরোজপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৮৩৬ জন এবং ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৬২২ জন। বরগুনায় ৯২১, বরিশালে ৭১২, পটুয়াখালীতে ৬৬১ এবং ভোলায় ৩৫৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৩৮২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬ হাজার ৩৯ জন।

এদিকে শুধু বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ৪১৮ জন এবং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. মাজহারুল রেজওয়ান রেজা বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত মশারি রয়েছে এবং মেডিসিন ওয়ার্ডগুলোতে মশারি দেওয়া হয়েছে। তবে রোগীরা মশারি নিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ায় পরে নার্সদের হিসাব দিতে হয়।

পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। কিন্তু জায়গার সংকটের কারণে মেডিসিন ওয়ার্ডগুলোতেই আলাদা কর্নার করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, অনেক সময় বেডের সংকট থাকে। পাশাপাশি সব শয্যার পাশে মশারি টাঙানোর মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ডেঙ্গু রোগীদের মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা যখন প্রায় ৭ হাজার, মৃত্যুও যখন ১০ জনে পৌঁছেছে, তখন বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই যদি ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা রাখা না যায়, মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করা না যায় এবং সাধারণ রোগীদের সঙ্গে একসঙ্গে চিকিৎসা দিতে হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।

হাসপাতালের জায়গার সংকট, মশারি ব্যবস্থাপনা বা জনবল সংকট—যে সমস্যাই থাকুক, তার বোঝা রোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আগেই যদি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত মশারি ও নিরাপদ রোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে হাসপাতালেই ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *