প্রতিদিনের বরিশালবরিশালবরিশাল জেলাবরিশাল সদর

শায়েস্তাবাদ ইউপির প্যানেল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১৩ অভিযোগ,তদন্ত রিপোর্ট নিয়ে তালবাহানা করছে তদন্তকারী কর্মকর্তা।

প্রকাশিত :
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬
/
৪০ বার সংবাদটি দেখেছে

 

বরিশাল: বরিশাল সদর উপজেলার ৪নং শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শামছুল কবির ফরহাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, আর্থিক অসঙ্গতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলে অনাস্থা প্রস্তাব দিয়েছেন পরিষদের নির্বাচিত ৯ সদস্য।

গত ৬ সেপ্টেম্বর বরিশাল জেলা প্রশাসক ও বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ ও অনাস্থা প্রস্তাব দেন তারা। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অভিযোগকারী ৯ ইউপি সদস্য হলেন—১ নম্বর ওয়ার্ডের মো. কবির হোসেন, ২ নম্বর ওয়ার্ডের মো. সবুজ খান, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. রিয়াজ উদ্দিন খান, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আল আমিন (ফায়জুল মৃধা), ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জসিম খান, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দ আনোয়ার হোসেন এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসা. লাবনী, মোসা. কাজল বেগম ও মোসা. সান্তা ইসলাম।

অভিযোগের তালিকা

লিখিত অভিযোগে সদস্যরা দাবি করেন, পরিষদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমন্বয় না করে এককভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। পরিষদের সভা ও রেজুলেশনের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করার পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের হিসাবও সদস্যদের দেওয়া হচ্ছে না।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. হোল্ডিং নম্বর প্লেটের নামে অর্থ আদায়:
সাবেক চেয়ারম্যানের সময় ইউনিয়নের প্রতিটি বাড়িতে হোল্ডিং নম্বর প্লেট দেওয়া হলেও তা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় পুনরায় প্লেট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। প্রতিটি প্লেটের জন্য ২০০ টাকা করে আদায় এবং প্রায় ৭ হাজার প্লেটের হিসাবে আনুমানিক ১৪ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন সদস্যরা। এই অর্থ পরিষদের হিসাবভুক্ত ও তহবিলে জমা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

২. এডিপির টিউবওয়েল স্থাপন না করে বিল উত্তোলনের অভিযোগ:
২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপির ডিপ-টিউবওয়েল প্রকল্পে টিউবওয়েল স্থাপন না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ করেছেন সদস্যরা।

৩. হতদরিদ্রের চাল আত্মসাতের অভিযোগ:
সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া ১০ কেজি করে চাল প্রকৃত উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ না করে আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

৪. ১ শতাংশের ৫০ লাখ টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ:
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ শতাংশ বরাদ্দের ৫০ লাখ টাকার ক্ষেত্রে যথাযথ রেজুলেশন ছাড়াই আংশিক কাজ করে পুরো অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন সদস্যরা।

৫. ভূমি করের ১ শতাংশের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ:
ভূমি কর থেকে পাওয়া ১ শতাংশের অর্থ গোপনে আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়েছে।

৬. ইউনিয়ন পরিষদ সংস্কারের ৯ লাখ টাকা:
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদ সংস্কারের নামে ১ শতাংশের বরাদ্দ থেকে ৯ লাখ টাকা নেওয়া হলেও অদ্যাবধি কাজ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

৭. শিক্ষা উপকরণের ৮ লাখ টাকা:
শিক্ষা উপকরণ বিতরণের নামে ১ শতাংশ বরাদ্দ থেকে ৮ লাখ টাকা নেওয়া হলেও ঘোষিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ সদস্যদের। বিষয়টি পরিষদের সভায় জানতে চাইলে প্যানেল চেয়ারম্যান এড়িয়ে যান বলেও দাবি তাদের।

৮. দুটি খেয়াঘাটের ইজারার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ:
শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের চর হবিনগর ও কামারপাড়া খেয়াঘাট ইজারা দিয়ে পাওয়া অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

৯. জেলা পরিষদের বরাদ্দের অর্থ নিয়ে অভিযোগ:
চাপিলাদী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবন ও মাঠ সংস্কারের জন্য জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ পাওয়া অর্থের বিপরীতে কাজ না করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন সদস্যরা।

১০. গ্রাম পুলিশ নিয়োগে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ:
গ্রাম পুলিশ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।

১১. সদস্যদের সম্মানী না দেওয়ার অভিযোগ:
গত দুই বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদের আয় থেকে নির্বাচিত সদস্যদের কোনো সম্মানী দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

১২. ‘বিশেষ বরাদ্দ’ দেখিয়ে অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ:
১ শতাংশের বরাদ্দকে ‘মাননীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বিশেষ বরাদ্দ’ হিসেবে উল্লেখ করে অর্থ গ্রহণ বা ব্যয় করার অভিযোগ করেছেন সদস্যরা। অর্থের প্রকৃত উৎস, অনুমোদন ও ব্যয়ের হিসাব যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

১৩. সদস্যদের না জানিয়ে বাজার উন্নয়ন কাজের অভিযোগ:
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের অবগত না করে শায়েস্তাবাদ বাজার উন্নয়নের কাজ করানোর অভিযোগ করা হয়েছে। ওই কাজের অর্থ কোন বরাদ্দ থেকে নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সদস্যরা।

তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের অভিযোগের পর শামছুল কবিরের বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব বরিশাল সদর উপজেলার আইসিটি/সহকারী প্রোগ্রামার কর্মকর্তা মো. রবিউল আলমকে দেওয়া হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্তে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া গেলেও প্রতিবেদন দাখিলে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, কোনো ধরনের প্রভাব বা আর্থিক সুবিধার কারণে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে গড়িমসি করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নিরপেক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, শামছুল কবিরকে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আল নাহিয়ান খান জয়ের সঙ্গে তার ছবি ও যোগাযোগের বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলেও তারা দাবি করেছেন। এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এর আগে ২০২৬ সালের মে মাসে শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান শামছুল কবির ফরহাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মানববন্ধনের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে ঘাট দখল, ড্রেজার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দের চাল ব্যবহারের মতো অভিযোগ তোলা হয়।

প্রশাসনের বক্তব্য

বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ফরিদা সুলতানা বলেন, প্যানেল চেয়ারম্যান মো. শামছুল কবিরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর আইসিটি কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটেও ফরিদা সুলতানাকে বর্তমান ইউএনও হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরিশাল জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মামুন খন্দকারও অভিযোগগুলো তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, বরাদ্দের হিসাব, প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্য এবং তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *