
বরিশালে প্রসূতির মৃত্যু! চিকিৎসককে নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন
দেশের বানী | স্টাফ করেসপন্ডেন্ট : বরিশাল নগরের রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর নাজিয়া রহমান মাইশা (৩০) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন নিহতের স্বজনরা।
নাজিয়া রহমান মাইশা বরিশাল নগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। পরিবারের ভাষ্য, বিয়ের প্রায় এক বছর পর প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসক ডা. তহুরা আক্তারের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রোপচারের সময় মাইশার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। একপর্যায়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। পরে তাকে দ্রুত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের পরিবারের দাবি, রাহাত আনোয়ার হাসপাতাল থেকে প্রথমে মাইশার হৃদ্স্পন্দন থাকার কথা জানিয়ে জরুরি চিকিৎসার জন্য শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় চিকিৎসায় গাফিলতি ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলেছেন স্বজনরা।
অন্যদিকে, এ বিষয়টি ছরিয়ে পরলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ডা: তহুরার বিপক্ষে শুরু হয় আলাচনা সমালোচনার ঝড়। বিভিন্ন রোগী ও স্বজরা লিখেছেন ডা. তহুরা আক্তারের চিকিৎসাসেবা নিয়ে ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে।
মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, তার পরিবারের একাধিক সদস্য ডা. তহুরার চিকিৎসা নিয়েছেন এবং তারা সুস্থ হয়েছেন। তার ভাষ্য, চিকিৎসক রোগীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন এবং মনোযোগ দিয়ে কথা শোনেন।
নাসির বারিক নামে আরেক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে ডা. তহুরার কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। তার অভিজ্ঞতায় চিকিৎসককে বিনয়ী ও ভালো চিকিৎসক মনে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি মাইশার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
তবে তানজিল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডা. তহুরার বিরুদ্ধে রোগী দেখার সময় তাড়াহুড়া করা এবং চিকিৎসাসেবায় পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। নিজের স্ত্রীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ নিয়েও অসন্তোষের কথা জানান তিনি। তার এসব বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; এর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইসরাত জাহান নামে এক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য খাতে নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি চিকিৎসকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অর্থ ও উদাসীনতার কারণে মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার অভিযোগ করেন এবং দায়িত্বশীল চিকিৎসকদের প্রশংসা করেন।
অপরদিকে অভিযোগের বিষয়ে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালের ম্যানেজার সাহিল আহমেদ সাকিব বলেন, রোগীর মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা চিকিৎসকেরা দায়ী নন। তার দাবি, শ্বাসনালিতে খাবার আটকে রোগীর মৃত্যু হয়।
সাকিব জানান, বেলা ১২টার দিকে মাইশাকে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করেন। পরে রোগীর স্বজনরা সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের অনুরোধ করেন। এ কারণে বিকেল ৩টার দিকে তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় এবং সাড়ে ৩টার দিকে ডা. তহুরা আক্তার অস্ত্রোপচার শুরু করেন।
অন্যদিকে স্বজনরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ করছেন। ফলে নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না—তা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালনরত এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঘটনাটি নিয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো কাগজপত্র বা লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে ডা. তহুরা আক্তারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের গাফিলতি বা ভুল হয়েছিল কি না, তা চিকিৎসা নথি, অপারেশন-সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বপে মনে করছেন সচেতন মহল।
মন্তব্য
0 টি মন্তব্য