ধর্ম ও জীবন

নিজেকে ধোঁকা দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি

প্রকাশিত :
শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
/
১১ বার সংবাদটি দেখেছে

অন্যের সঙ্গে প্রতারণা করলে একসময় না একসময় তা প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু মানুষ যখন নিজেকেই ধোঁকা দিতে শুরু করে, তখন বিপদ আরও গভীর হয়ে ওঠে। কারণ আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার ব্যক্তি অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তিনি ভুল পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। বরং নিজের ভুলের পক্ষে নানা যুক্তি দাঁড় করান, গুনাহকে তুচ্ছ মনে করেন এবং নফসের প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করে নিজেকেই বোঝাতে থাকেন—‘আমি তো খারাপ কিছু করছি না।’

এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষ সত্য থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যার মন্দ কাজকে তার কাছে সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে, ফলে সে তা উত্তম মনে করে—সে কি তার মতো যে সঠিক পথে রয়েছে?’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৮)

এই আয়াত আত্মপ্রবঞ্চনার ভয়াবহ দিকটি স্পষ্ট করে। শুধু পাপ করাই বিপদের বিষয় নয়; বরং পাপ করার পরও সেটিকে পাপ মনে না করাই আরও ভয়ংকর। যখন মানুষের বিবেক অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে দেখতে অস্বীকার করে, তখন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাও তার কাছে আর অনুভূত হয় না।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বরং তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি বিষয়কে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১৮)

নফস অনেক সময় মানুষের সামনে তার ভুলকে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপন করে। ফলে যে কাজ থেকে ফিরে আসা উচিত, মানুষ সেটিকেই স্বাভাবিক কিংবা যুক্তিসংগত মনে করতে শুরু করে।

নিজের আমলের হিসাব নেওয়া জরুরি

আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় হলো নিয়মিত নিজের আমল ও জীবনযাপন পর্যালোচনা করা। আমি কী করছি, কেন করছি এবং আমার কাজগুলো আল্লাহর কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব প্রশ্ন নিজেকেই করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ করে, সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)

এই আয়াত মুমিনকে আত্মসমালোচনা ও আত্মজিজ্ঞাসার শিক্ষা দেয়। আমার উপার্জন কি হালাল? আমার নামাজের অবস্থা কেমন? মানুষের সঙ্গে আমার আচরণ কেমন? আমার গোপন জীবন কি প্রকাশ্য জীবনের মতোই পরিচ্ছন্ন? আমি অন্যকে যে নসিহত করি, নিজে কি তা মানার চেষ্টা করি?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারাই আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে। আর অক্ষম সে, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে শুধু আশা পোষণ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৯)

তওবা পিছিয়ে দেওয়াও আত্মপ্রবঞ্চনা

আত্মপ্রবঞ্চনার আরেকটি ভয়ংকর রূপ হলো—গুনাহ স্বীকার করার পরও তওবাকে বারবার পিছিয়ে দেওয়া। মানুষ ভাবে, ‘আরেকটু পরে তওবা করব’, ‘বয়স হলে ইবাদত করব’ কিংবা ‘এখন জীবনটা উপভোগ করি।’

কিন্তু মানুষ জানে না, তার জীবনের শেষ মুহূর্ত কখন এসে উপস্থিত হবে। এ ধরনের মিথ্যা আশা তাকে তওবা ও সংশোধনের পথ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! তোমার মহান প্রতিপালক সম্পর্কে কোন বিষয়টি তোমাকে প্রতারিত করেছে?’ (সুরা : ইনফিতার, আয়াত : ৬)

তাই ভুল বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। কারণ তওবার জন্য ‘পরে’ বলে কোনো নিশ্চিত সময় মানুষের হাতে নেই।

ভুল স্বীকার করাই সংশোধনের শুরু

অনেকেই মনে করেন, নিজের ভুল স্বীকার করলে সম্মান কমে যাবে। অথচ বাস্তবে ভুল স্বীকার করাই সংশোধনের প্রথম ধাপ। যে ব্যক্তি বলতে পারেন—‘আমি ভুল করেছি, আমাকে সংশোধন হতে হবে’—তিনি আত্মপ্রবঞ্চনার দেয়াল ভাঙতে শুরু করেছেন।

অন্যদিকে, ভুল করার পরও যে ব্যক্তি অজুহাত খুঁজতে থাকেন, অন্যের ওপর দায় চাপান কিংবা নিজের ত্রুটিকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন, তিনি নিজের জন্য সংশোধনের পথ আরও কঠিন করে তোলেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো। নিশ্চয়ই সত্য নেকির দিকে নিয়ে যায় এবং নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায় এবং পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭১)

আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে বাঁচার পথ

আত্মপ্রবঞ্চনা এমন এক নীরব বিপদ, যা বাইরে থেকে মানুষের জীবনকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতর থেকে তার আত্মাকে দুর্বল করে দিতে পারে। নিজের ভুলকে সঠিক মনে করা, গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা, তওবাকে পিছিয়ে দেওয়া এবং নফসের প্রবৃত্তিকে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ ধীরে ধীরে সত্য থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

তাই নিজের প্রতি সৎ হওয়া জরুরি। প্রতিদিন নিজের কাজের হিসাব নেওয়া, ভুল হলে তা স্বীকার করা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করাই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে বাঁচার অন্যতম পথ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের নফসের প্রতারণা থেকে হেফাজত করুন, নিজেদের ভুল চিনতে ও স্বীকার করতে তাওফিক দিন এবং মৃত্যুর আগে নিজেদের হিসাব নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।



বাপ্পি/সা.এ

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *