
বরিশালে জলাশয় ভরাটের মহোৎসব! ড্রেজার সাম্রাজ্যের নেপথ্যে কারা?
তন্ময় তপু |দেশের বানী : বরিশাল নগরীর প্রাণপ্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে পুকুর ও জলাশয় ভরাটের মহোৎসব। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নগরীর কাউনিয়া এলাকায় একটি প্রভাবশালী চক্র দেদারছে বালু দিয়ে ভরাট করছে একের পর এক জলাশয়। বড় বড় বাল্কহেড করে বরিশাল সদর উপজেলার তালতলী নদীতে বালু এনে সেই বাল্কহেডে ড্রেজার বসিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে নগরীর ভেতর এই বালু আনা হচ্ছে। আর এসবের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে উঠে এসেছে সাবেক কাউন্সিলর ও ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ শামসুদ্দাহা আবিদের নাম। কাউনিয়া থানা পুলিশের সামনেই দিনরাত চলা এই কার্যক্রম স্থানীয় পরিবেশ ও জনজীবন তীব্র ক্ষোভ ও বিপর্যয় নেমে এসেছে।
সরেজমিন কাউনিয়া এলাকাঘুরে ভয়াবহ চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। বাল্কহেড করে বিভিন্ন জায়গা থেকে উত্তোলন করা বালু তালতলী নদী থেকে ৮টি ড্রেজারের মাধ্যমে কাউনিয়া এলাকার কয়েক কিলোমিটারজুড়ে অন্তত ২২টি পাইপ দিয়ে জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে প্রতিরাতে। দিনেও লোকসমাগম বেশি হওয়ার সমস্যা থাকায় রাতেই ড্রেজারের মাধ্যমে এই এলাকার জলাশয় একের পর এক ভরাট করা হচ্ছে। কাউনিয়ার পুরান পাড়া, হাউজিং, টেক্সটাইল মোড়, রোকয়া আজিম সড়ক, তাফাজ্জল হোসেন সড়ক, ময়লা খাল, কাউনিয়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মনসা গলি, কাউনিয়া ১ম গলি ও বিসিক এলাকা সহ বেশ কয়েকটি এলাকার অলিগলির মধ্যে ড্রেজারের পাইপ সংযোগ রয়েছে। বলা যায়, নগরীর ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড ড্রেজার ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই জলাশয় ভরাট চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিঘার পর বিঘা নিচু জমি, পুকুর ও জলাশয় রাতারাতি বালুচরে পরিণত করা হচ্ছে। কাউনিয়া এলাকায় শুধু বালু দিয়ে জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে।
৩নং ওয়ার্ডের পুরান পাড়া এলাকার বাসিন্দা ওয়াহাব সিকদার অভিযোগ করেন, ৭/৮ মাস আগে আমার জমির ওপর দিয়ে ড্রেজারের পাইপ বসাতে ২০/২৫ জন লোক এসেছিল। আমি তাদের এই পাইপ বসাতে বাধাও দিই। কিন্তু আমাকে হুমকি-ধামকি দিয়ে পাইপ বসিয়েছে। আমি তাদের কাউকেই চিনি না, বলেছে ছাত্রদলের লোকজন। পাইপ দীর্ঘদিন থাকায় আমি আমার জমিতে রাস্তার কাজও করতে পারছি না।
রোকয়া আজিম সড়কের ভাড়াটিয়া বাসিন্দা লাবলু হাওলাদার বলেন, ৬ মাস আগে এই এলাকায় ড্রেজারের পাইপ ঢুকেছে। কী গত এক মাসের মধ্যে ৭/৮টি পুকুর ভরাট হয়ে গেছে। কেউ এখন দখল কিছুই বুঝতে পারবে না, কারণ এর ওপর ঘাস ভরে গেছে।
আরও পড়ুন : বরিশালে সমিতির আড়ালে গ্রাহকের সর্বনাশ!
সাইদুর রহমান কামাল নামের কাউনিয়া হাউজিং এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা মন্তব্য করেন, আইন অনুযায়ী জলাশয় বা পুকুর ভরাট দণ্ডনীয় অপরাধ। সেখানে সরকার পতনের পর দিনের আলোতে ড্রেজার দিয়ে দিয়ে অন্তত ৫০টিরও বেশি ছোট-বড় পুকুর ও জলাশয় ভরাট করা হয়েছে এই এলাকায়। এখানকার বড় থেকে ছোট সকল নেতাকর্মী এই ড্রেজার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কম-বেশি টাকা পেয়েছেন। তালিকা করে ১৮৭ জনকে এই টাকা বা চাঁদা দিয়ে কাউনিয়া এলাকাকে মরুভূমি করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপির কিছু লোকজন। ড্রেজার যদি ঠিকভাবে আর ৩ মাস চলতে পারে, তাহলে কাউনিয়ায় আর কোনো জলাশয় থাকবে না।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের দুইজন কর্মকর্তা আগামী সময়কে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এক ঈদের ছুটিতে প্রথম কাউনিয়ার মনসা গলি এলাকায় বড় একটি পুকুর ভরাটের কাজ শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে ছোট-বড় জলাশয় ও পুকুর ভরাট শুরু করে চক্রটি। তালতলী নদীতে নোঙর করা বাল্কহেড থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২৫টি পাইপ কাউনিয়ায় বালু প্রবেশ করে। সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক রায়হান কাওছার আর্থিক সুবিধা নিয়ে অঘোষিতভাবে পুকুর ও জলাশয় ভরাটের অনুমোদন দিয়েছিলেন। সেই থেকে দিন দিন শুধু পাইপের সংখ্যা বাড়ছে আর জলাশয় কমছে। ড্রেজার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা নেয় কাউনিয়া থানা পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সড়ক পরিদর্শকরা। তাছাড়া স্থানীয় বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদল নেতাকর্মীদেরকে চাঁদা না দিয়ে পুরো কাউনিয়ায় বিস্তৃত করে ড্রেজারের মাধ্যমে জলাশয় ভরাট করতে পারা যায় না। শুধু তালতলী নদী থেকেই নয়, কীর্তনখোলা নদী থেকেও ড্রেজার করে নগরীতে পাইপের মাধ্যমে বালু দিয়ে জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে কয়েকটি জায়গায়। সম্প্রতি কোস্টগার্ড বেশ কয়েকটি ড্রেজার, বাল্কহেড আটক ও জরিমানা করলেও মূল হোতাদের খুঁজে পায়নি, বরং পুকুর ও জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে আগের থেকে বেশি গতিতে।
এক ড্রেজার মালিক খুব গোপনীয়তার সঙ্গে প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করে স্বীকার করেছেন সর্বমহলে চাঁদা দেওয়ার কথা। নগরীর কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা এই ড্রেজার মালিক বলেন, কীর্তনখোলা নদী থেকে বালু উত্তোলন থেকে শুরু করে কাউনিয়া এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু সরবরাহের পুরা কাজ ৪নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শামসুদ্দাহা আবিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এখনো। দল পরিবর্তন হলেও তার অবৈধ এই ব্যবসায় কোনো প্রভাব পড়েনি। তালতলী নদী, আড়িয়াল খাঁ নদ ও কীর্তনখোলা নদীতে যত ড্রেজার রয়েছে সব আবিদের একক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি কাউনিয়ায় সকল বিএনপি নেতা ও কয়েকজন সাংবাদিককে ম্যানেজ করে ড্রেজারের পাইপ দিয়ে বালু সরবরাহ করছেন। বড় মাথা থেকে ছোট মাথা এমন কোনো বিএনপি নেতা নেই যে কাউনিয়ায় বালু ভরাটের টাকা পায় না। কাউকে এককালীন আবার কাউকে মাসে মাসে টাকা দেওয়া হয়। ৫ হাজার থেকে শুরু করে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এক বিএনপি নেতাকে এককালীন ২০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে আবার মাস মাসও তাকে দিতে হয়। যতদিন ড্রেজার চালানো যাবে ততদিন টাকা বা চাঁদা দিতে হবে। সবাইকে ম্যানেজ না করে নগরীতে ড্রেজার চালানো সম্ভব না। আবিদ সরাসরি সামনে না এসে তার লোকজন দিয়ে দেদারছে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে এ বিষয় সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ শামসুদ্দাহা আবিদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় পরিবেশবিদদের তথ্য মতে, গত ৫০ বছরে বরিশাল নগরীর প্রায় ৭০ ভাগ পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। আশির দশক বা তার আগে যেখানে হাজারেরও বেশি ছোট-বড় পুকুর ছিল, তা এখন আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে। সরকারি ৩০টি পুকুরের বাইরে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে এখনো কয়েকশ ব্যক্তিমালিকানাধীন বা পারিবারিক পুকুর টিকে আছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ না থাকায় বর্তমানে সংখ্যার সঠিক সরকারি হিসাব পাওয়া কঠিন। তবে পরিবেশবাদীদের ধারণা, সব মিলিয়ে বর্তমান দৃশ্যমান বা ব্যবহারযোগ্য পুকুরের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৪০০টির বেশি হবে না, যার বড় অংশই এখন ভরাট-আতঙ্কে ভুগছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়েছে আশঙ্কাজনক হারে, যার মধ্যে কাউনিয়া এলাকাতেই ভরাট হয়েছে সবচেয়ে বেশি। নদী কাছে থাকায় সুযোগ কাজে লাগিয়েছে জমির মালিকদের সঙ্গে ড্রেজার পরিচালনাকারীরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আদালত বরিশালের সমন্বয়ক রফিকুল আলমের মন্তব্য, কাউনিয়াজুড়ে প্রতিদিন একের পর এক জলাশয় ও পুকুর নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। বিষয়টি সিটি করপোরেশনের সভায় জোর গলায় বলেছি। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এটা খুবই দুঃখজনক।
এভাবে জলাশয় ভরাট হতে থাকলে সামান্য বৃষ্টিতেই কাউনিয়া ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। এছাড়া আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের পানি পাওয়ার কোনো উৎস থাকবে না, যা পুরো এলাকার জন্য এক বিশাল অগ্নিঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি যোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তাকে কলঙ্কিত করেছে এই ভূমিদস্যুরা। কাউনিয়ার জলাশয়গুলো বাঁচাতে অবিলম্বে এই অবৈধ ড্রেজার বন্ধ করতে হবে এবং ভরাটকৃত জলাশয়গুলো পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিতে হবে।
বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন বলেন, যখন প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন, সেখানে বরিশালে একের পর এক জলাশয় ভরাটের খবর খুবই উদ্বেগজনক। যারা জলাশয় ও পুকুর ভরাটের মতো অবৈধকাজে জড়িত তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিণ বলেন, নগরীতে ড্রেজার চালিয়ে বালু ভরাটের অনুমতি সাবেক প্রশাসক দিয়ে গেছেন। সড়ক পরিদর্শকদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হবে ড্রেজারগুলোর ব্যাপারে। সাধারণ মানুষের সচেতনতা এসব বিষয়ে খুবই জরুরি।
মন্তব্য
0 টি মন্তব্য