জাতীয়

বাংলাদেশ থেকে ‘চুরি’ হওয়া লেমুর এখন আম্বানির চিড়িয়াখানায়

প্রকাশিত :
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
/
৮ বার সংবাদটি দেখেছে

গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া বিপন্ন প্রজাতির তিনটি রিংটেইল লেমুরের মধ্যে দুটির সন্ধান মিলেছে ভারতের গুজরাটে। প্রাণী দুটি ভারতের শীর্ষ ধনকুবের অনন্ত আম্বানির বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ প্রকল্প ‘বনতারা’য় রয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, একাধিক হাত ঘুরে লেমুর দুটি প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হয়েছিল।

বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। তবে লেমুর দুটির শরীরে মাইক্রোচিপ, স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ নম্বর কিংবা সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইল না থাকায় মালিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত করে ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিয়েছে।

আজ কের পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সিআইডির তদন্ত এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও লেমুর চুরি ও পাচারের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ গভীর রাতে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি হয়। এর মধ্যে দুটি পরে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। ঘটনার পরদিন সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ মামলা করলে এর তদন্তভার নেয় সিআইডি।

তদন্তে উঠে এসেছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া নিরাপত্তাকর্মী নিপেন মাহমুদের সহযোগিতায় জুয়েল নামের এক বন্য প্রাণী চোরাকারবারি লেমুরগুলো চুরি করেন। পরে বস্তায় ভরে প্রাণীগুলো একটি বাড়িতে নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে লেমুরগুলোর ভিডিও ও ছবি ধারণ করে ভারতীয় সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়।

২০২৫ সালের মে মাসে কলকাতার বাবলু ও মুম্বাইয়ের শিপলু নামের দুই ব্যক্তি লেমুর কিনতে বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের কাজ করেন দেলোয়ার ও তপন নামের দুই ব্যক্তি। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একটি প্রাপ্তবয়স্ক লেমুর ও একটি শাবক ১৭ লাখ টাকায় বিক্রির চুক্তি হয়। অন্য শাবকটির দাম নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ টাকা।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, স্থানীয় এক সীমান্ত লাইনম্যানের সহযোগিতায় দুটি লেমুর দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়। পরে একাধিক ব্যক্তির হাত ঘুরে প্রাণী দুটি গুজরাটের জামনগরে পৌঁছায়। সেখান থেকে ভারতীয় ক্রেতারা লেমুর দুটি ‘বনতারা’ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করেন।

পরবর্তীতে বনতারা কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেমুর দুটির ছবি প্রকাশ করলে বিষয়টি বাংলাদেশের তদন্তকারীদের নজরে আসে। ছবির সঙ্গে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া লেমুরগুলোর মিল পাওয়ার পর প্রাণী দুটি দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য না থাকায় এই উদ্যোগে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, পাচার হওয়া বন্য প্রাণীর পরিচয় ও মালিকানা নিশ্চিত করতে মাইক্রোচিপ, নিবন্ধন নম্বর ও ডিএনএ প্রোফাইল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি সময় সাফারি পার্কে থাকার পরও লেমুরগুলোর ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করা হয়নি। কোনো মাইক্রোচিপ বা স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও ছিল না।

বর্তমানে সাফারি পার্কে থাকা একটি শাবক লেমুরের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে ভারতে থাকা দুটি লেমুরের সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্ক যাচাইয়ের চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে প্রাণী দুটির পরিচয় বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক সুনীল দাশ বলেন, ২০১৮ সালের আগস্টে কাস্টমসে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিরল প্রজাতির দুটি লেমুর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে আনা হয়েছিল। ধরা পড়ার পর এগুলো গাজীপুর সাফারি পার্কে রাখা হয়। পরে আন্তর্জাতিক একটি চক্রের নজরে পড়ে প্রাণীগুলো এবং নিরাপত্তাকর্মীর সহযোগিতায় সেগুলো চুরি করে সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয়।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানে ওই সময় বিরল পাখি ও প্রাণীর একটি বড় অবৈধ চালান জব্দ হয়েছিল। চালানটিতে লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, ময়ূরসহ এক জোড়া লেমুর ছিল। পরে চালানের একটি অংশ গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।

তদন্তে আরও জানা যায়, পাখি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে লেমুরগুলো দেশে আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে সাফারি পার্কে থাকা ওই জোড়া লেমুরের দুটি শাবক জন্ম নেয়। বাবা লেমুরটি মারা যাওয়ার পর পার্কে মা লেমুর ও দুটি শাবক ছিল।

এ ঘটনায় মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দেলোয়ার ও জহির মিয়া নামের দুই আসামির জবানবন্দি নেওয়া সম্ভব হয়নি। গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে তাঁরা আত্মগোপনে চলে যান। তদন্তে জহির মিয়ার বিরুদ্ধে এর আগে ম্যাকাও পাখি চুরির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

লেমুর আমদানি করা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এএসএইচএ ইন্টারপ্রাইজের নামও তদন্তে এসেছে। তেজগাঁওয়ের মণিপুরীপাড়ায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. আতিউল হাফিজ সাদ ফোনে জানান, তাঁদের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ব্যবসা পারিবারিক। কারা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে লেমুরগুলো আমদানি করেছিল, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে বর্তমানে তথ্য নেই।

রিংটেইল লেমুর আফ্রিকার মাদাগাস্কার দ্বীপের স্থানীয় প্রাণী। কালো-সাদা বলয়যুক্ত দীর্ঘ লেজের কারণে প্রাণীটি সহজেই শনাক্ত করা যায়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় প্রজাতিটি ‘গুরুতরভাবে বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। একই সঙ্গে এটি বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশন (সাইটিস)-এর পরিশিষ্ট-১-এর অন্তর্ভুক্ত। ফলে বিশেষ শর্ত ছাড়া এ প্রাণীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষিদ্ধ।

বন্য প্রাণী ও চিড়িয়াখানা বিশেষজ্ঞ মো. রেজা খান বলেন, দুর্লভ ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণে নেওয়ার পরই তাদের ডিএনএ প্রোফাইলসহ স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ তথ্য সংরক্ষণ করা উচিত। এতে কোনো প্রাণী চুরি বা পাচার হলে পরিচয় ও মালিকানা নিশ্চিত করা সহজ হয়।

তিনি আরও বলেন, সীমান্ত দিয়ে বন্য প্রাণী পাচার ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, বিশেষ করে সিসিটিভি ও আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে বন্য প্রাণী চুরি ও পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বন অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা জরুরি।



কুশল/সাএ

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *