অপরাধ

যেভাবে প্রিজন ভ্যান থেকে পালাল জেনেভা ক্যাম্পের মাদকসম্রাট

প্রকাশিত :
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
/
১৬ বার সংবাদটি দেখেছে

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার ও সংঘর্ষের ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় অপরাধী চক্রগুলো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানের পরও ক্যাম্পে মাদকের কারবার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এরই মধ্যে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ক্যাম্পের অন্যতম আলোচিত মাদক কারবারি রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’।

গত ১৯ মে নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৭ বছর বয়সী এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানাতেই ২৯টি মামলা রয়েছে—তিনটি হত্যা, সাতটি হত্যাচেষ্টা, চারটি বিস্ফোরক ও ১৩টি মাদক মামলা।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান তিনি। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পাঁচ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

যেভাবে অপরাধ জগতে পিচ্চি রাজা

পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, শুরুতে পিচ্চি রাজা পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। পরে আয় কম হওয়ায় একটি গ্যাস পাম্পে চাকরি নেন। সেখানে দৈনিক প্রায় তিন হাজার টাকা আয় করতেন। একটি ঘটনায় চাকরি হারানোর পর তিনি আবার জেনেভা ক্যাম্পে ফিরে আসেন।

২০১৮ সালে ক্যাম্পে পুলিশের অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে মাদক না পেলেও ৫১ পিস ইয়াবা উদ্ধারের মামলা দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেছেন। এটিই ছিল তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা। প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে মাদক বিক্রি শুরু করেন। প্রথমদিকে অল্প পরিমাণ মাদক কিনে বিক্রি করলেও ধীরে ধীরে বড় পরিসরের কারবারে জড়িয়ে পড়েন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০১৪ সালের পর অল্প বয়সেই ক্যাম্পের মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সঙ্গে যুক্ত হন রাজা। একই সময়ে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসেবেও কাজ করায় অপরাধজগতের পাশাপাশি বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ২০২০ সালে ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর ক্যাম্পের একটি অংশের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে আসে।

পরবর্তী সময়ে টেকনাফ থেকে মাদকের চালান এনে জেনেভা ক্যাম্পে সরবরাহের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ

৫ আগস্টের পর ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পিচ্চি রাজার সঙ্গে বুনিয়া সোহেলসহ কয়েকটি গ্রুপের বিরোধ তীব্র হয়। মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ, লাইনম্যান নিয়োগ, অর্থ আদায় ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পিচ্চি রাজা পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে দাবি করেছেন, ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের ‘রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। সেখান থেকেই ধারাবাহিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিরোধের জেরে ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সংঘর্ষের ঘটনায় বুনিয়া সোহেলের নামও বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা তাকে প্রশ্রয় দিয়েছে—সে বিষয়ে পিচ্চি রাজা সরাসরি কোনো তথ্য দেননি বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, বুনিয়া সোহেলের ওপর হামলা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর ক্যাম্পের মাদক ব্যবসায় আবারও পিচ্চি রাজার প্রভাব বাড়ে।

সম্পদ গড়ার অভিযোগ

মাদক ব্যবসার পাশাপাশি পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ-সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কাজে বিনিয়োগ করা হয়েছে। তার শ্বশুর খোরশেদ, শালা নয়ন ও ফুফাতো ভাই রনিসহ কয়েকজন আত্মীয় এই অর্থ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পিচ্চি রাজার ২৫ থেকে ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি রয়েছে।

এ ছাড়া আদি, নবাব, শাহজাদা, ফাইজান, বেলুন, রুবেল, রনি, নাটা সুমন, সুজন, ব্যাটারি কামরান, হীরা ও মঈন পিচ্চিসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে তার সঙ্গে মাদক কারবার ও বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তারা মাদক সরবরাহ, অর্থ আদায়, দখল নিশ্চিত করা ও প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর কাজে যুক্ত।

সোর্স পরিচয় নিয়ে পুলিশের বক্তব্য

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো অপরাধী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসেবে পরিচয় তৈরি করে পরে সেটিকে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে। এতে একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তার জায়গায় নতুন অপরাধী গড়ে ওঠে।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, কে পুলিশের সোর্স আর কে নয়, সেটি তাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, সেটিই মূল বিষয়।

তিনি জানান, জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চলছে। পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারেও পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।

পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে মামলা

এদিকে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় মামলা হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন জানান, থানার উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ মজুমদার বাদী হয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে মামলাটি করেন।

মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে পিচ্চি রাজাকে। তাকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।



কুশল/সাএ

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *