ফিচার ও সাহিত্য

শ্রীকৃষ্ণ—মানবজীবনের এক চিরন্তন দিশারী

প্রকাশিত :
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
/
১৩ বার সংবাদটি দেখেছে

বিশ্বনাথ রায় : স বহুকাল আগের কথা। দ্বাপর যুগের শেষ ভাগটা ছিল ঘোর অমানিশায় আচ্ছন্ন। রজগুণ মিশ্রিত অহংকার, দর্প ভারাক্রান্ত হয়ে পৃথিবী। মানব তার মান ও হুঁশ ভুলে আসুরিক শক্তিতে শক্তিমান হয়ে উঠল। সেই সময় ধরিত্রী দেবগণের শরণাপন্ন হলেন। পদ্মযোনি ব্রহ্মার সঙ্গে গাভীরূপ ধারণ করে, জগৎপতির সকাশে ক্ষীর সমুদ্র তীরে গমন করলেন এবং পুরুষোত্তমের স্তব করতে লাগলেন। অতঃপর পুরুষোত্তম আকাশবাণী করলেন, ‘আমি ধরার দুঃখ সম্পর্কে অবগত। ঈশ্বরের ঈশ্বর কালশক্তি সহকারে ধরিত্রীর ভার হরণ করার জন্য পৃথিবীতে অবতাররূপে অবতরণ করব। দেবগণ তাঁর আপন অংশ জন্মগ্রহণ করুন।’ সংসৃত শব্দ অবতার হচ্ছে কান বিশেষ উদ্দেশ্যক সামন রেখে অপ্রপঞ্চ থেকে প্রপঞ্চে ঈশ্বরের অবতরণ। যখন যখন এ নিখিল বিশ্ব ধর্ম গ্লানিময় হয়, অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন নিত্য নিরঞ্জন নিরাকার ঈশ্বর নরকলেবর ধারণ করেন। অর্থাৎ ‘অনুগ্রহায় ভূতানাং মানুষিং তনুমাশ্রিতম।’ এ পৃথিবীর সকলকে অনুগ্রহ করার জন্য মানুষরূপে তিনি অবতরণ করেন।

 

ভাগবত বলছেন, ‘কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ম্।’ সেই স্বয়ং এবার দেবকীর অষ্টম সন্তানরূপে কংসের কারাগারে ভাদ্র মাসের অষ্টমী তিথিতে আবির্ভূত হলেন। রোহিণী নক্ষত্রযুক্ত নিকষ এক ঝড়-ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ রাত্রিতে। এখান ভাদ্র শব্দটি ভাদ্রপদ নামক নক্ষত্র থেকে এসেছে। ভাদ্র+ষ্ণ= ভাদ্র, যার শাব্দিক অর্থ শুভ বা মঙ্গল। সেই মঙ্গল মাস সর্বমঙ্গলকারী শ্রীকৃষ্ণ ভগবান আবির্ভূত হলেন। জন্ম নয়া এ শিশুটি দেখতে কালো। কী জগতকে তাঁর আলোয় আলোকিত করলেন, অষ্টমী তিথিতে তাঁর জন্ম। মাটি, জল, আগুন, বায়ু, আকাশের সাথে মন, বুদ্ধি, অহংকার—এই অষ্টতত্ত্বই আমাদের জীব প্রকৃতি। যোগমার্গ সাধনায় আটটি স্তর আর এই আটেই বাঁধা পড়লেন জগদীশ্বর।

 

অন্তঃ সর্বশক্তিমান সত্ত্বার শাশ্বত সত্যরূপ শ্রীকৃষ্ণকে বিষ্ণুর সবচেয়ে অপরূপ অবতার বলে মনে করা হয়। সনাতনীরা বিশ্বাস করেন জন্মাষ্টমীতে শ্রীকৃষ্ণের আরাধনায় জগতের সর্বসুখ লাভ হয়। মঙ্গল হয় পরিবার, দেশ ও সমাজের। কৃষ্ণ ভগবান সনাতন ধর্মের প্রধান দেবতা তথা পরমেশ্বর। তাঁর ত্রিশক্তিতে অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর মিলে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় চক্র পরিচালনা করেন বলে সনাতনীরা বিশ্বাস করেন।

 

ভগবান কৃষ্ণচন্দ্র শ্রীমদ্ভগবত গীতার প্রধান চরিত্র। তিনি তাঁর করুণা, প্রেম এবং সুরক্ষার জন্য পরিচিত। তাঁকে প্রায়শই একজন যুবক ব্যক্তিত্ব, বাঁশি বাজাতে পারদর্শী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তিনি কি কেবল বাঁশি বাজাতে পারতেন? তা নয়, আমি বলব, কৃষ্ণ লীলার একটা সার্বিক আলোচনা হওয়া দরকার। তিনি ভারতবর্ষে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ১২৫ বছর জগত প্রকট ছিলেন। বৃন্দাবনে ১০ বছর ৮ মাস বা ১১, বড়জোর ১২ বছর ছিলেন। বাকি রইল ১১৩ বছর। শ্রীকৃষ্ণ একটা বিরাট প্রেক্ষাপট, আদর্শ মানুষরূপে গৃহীত হয়েছেন, পরবর্তীকালে পূজিত হয়েছেন। তিনি যে কত বড় রাজনীতিক ছিলেন, কূটনীতিক ছিলেন, অর্থনীতিক ছিলেন কিংবা বিরাট যোদ্ধা ছিলেন তা লিখে বর্ণনা করা অসম্ভব। গীতা তাঁর ম্যানিফেস্টো, দলিল বা ইশতেহার। গীতায় তিনি যেন বলতে চাইছেন—আমার জীবন লভিয়া জাগর সকল দেশ। গীতায় অর্জুনকে সামনে রেখে সকলকে একজন জ্ঞানী গুরু বা শিক্ষক হিসেবে আমাদের পূর্ণ জ্ঞান অর্থাৎ মনুষ্যত্বের জ্ঞান দান করলেন। নিষ্কাম কর্মযোগের শিক্ষা দিলেন, দিলেন জ্ঞান ও ভক্তির এক অনন্য পাঠ। কুরু-পাণ্ডবের মধ্যকার যুদ্ধটা আদতে আমাদের মনের ভালো-মন্দের যুদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রের মহানায়ক কিংবা সারথি সবকিছুই কৃষ্ণ ভগবান। বিষাদযোগে অর্জুনের চোখে জল এলো তাঁর সম্মুখে, জগত যিনি সকলের চোখের জল মুছাতে পারেন, তাই অর্জুনের বিষাদ যোগ পরিণত হলো। আদতে তিনি শুধু অর্জুনের সারথিই নন, তিনি আমাদের সকলের সারথি তথা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি যে প্রেম, ভালোবাসা, করুণা, সুরক্ষা এবং প্রজ্ঞার প্রতিমূর্তি।

 

শ্রীকৃষ্ণ জগতের বুকে অনেক নামে পরিচিত। যেমন গোপাল, গোবিন্দ, মুরলীধর, কেশব, গোপীবল্লভ ইত্যাদি—প্রতিটি নামই তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং ঐশ্বরিক প্রকৃতির একটি ভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়। আদতে তিনি একজন বহুমুখী দেবতা, যার গল্প এবং শিক্ষা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর জীবনাদর্শ ও কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে নিমিত্ত করে প্রদত্ত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার শাশ্বত জ্ঞান সমগ্র মানবজাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

 

একটি সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থাপনায় অত্যাবশ্যক বিষয়গুলোর অন্যতম হলো সংযত ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, ন্যায়-বিচার, সৎকর্ম, সাম্যবাদ ও পরমত সহিষ্ণুতা। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অমিয় বাণীর মধ্য দিয়ে এ সকল শিক্ষাই জগৎকল্যাণ সঞ্চারিত করছেন।

 

শুভ জন্মাষ্টমী উৎসব বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে অনুষ্ঠিত হয়। কাশ্মীরের পণ্ডিতরা জারম সতম (জন্ম সপ্তমী), মহারাষ্ট্রে দহি হান্ডি, জম্মু অঞ্চলে ঠাকুর দা ব্রত এবং গুজরাট ও রাজস্থানে মাসন হান্ডি, দক্ষিণ ভারতে মাসারু কুডিকা নামে পালিত হয়। ভারতের ব্রজ অঞ্চল জন্মাষ্টমী সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে পালিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও ফিজি সহ বিভিন্ন দেশে এ উৎসব সাড়ম্বরে পালিত হয়। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে জন্মাষ্টমীতেও এক বিশেষ রথযাত্রার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

 

শ্রীকৃষ্ণ ভগবান সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকগণ লিখেছেন। প্রাচীন ও আদি কবিদের মধ্যে জয়দেব (গীতগোবিন্দ), বড়চণ্ডীদাস (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন), বিদ্যাপতি (বৈষ্ণব পদাবলী) এবং দ্বিজ চণ্ডীদাস লিখেছেন। মধ্যযুগে জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস কবিরাজ, বাসুদেব দাস, নবদ্বীপ ঠাকুর ও সান্তকবি সুরদাস লিখেছেন। অনুবাদ ও ধারায় মালাধর বসু (গুণরাজ খান), সৈয়দ সুলতান, আলাওল, আফজল সুফি তত্ত্বের আলোকে রাধাকৃষ্ণের প্রেমের পদ রচনা করেছেন। এছাড়া পঞ্চকবি ও অন্যান্য আধুনিক যুগের কবিগণের মধ্যে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ (ভানুসিংহের পদাবলী), দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুল প্রসাদ সেন অন্যতম। লোকসংগীত ও বাউল সাধকদের মধ্যে লালনসাঁই, রাধারমণ দত্ত, হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম এবং চলচ্চিত্রের আধুনিক গীতিকারগণের মধ্যে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুকুল দত্ত অন্যতম।

 

পরিশেষে বলব, শ্রীকৃষ্ণ কোনো একটি যুগের যুগনায়ক নন, তিনি মানবজীবনের চিরন্তন এক দিশারী। সময়চক্র সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, পৃথিবী বদলেছে, কিন্তু মানুষের মধ্যকার হিংসা, দ্বেষ, অন্তর্দ্বন্দ্ব, ভালো-মন্দের টানাপড়েন, কর্তব্যের সংকট ও সত্যের সন্ধান আজও একইভাবে বিদ্যমান। আর সেখানেই কৃষ্ণ ভগবান বারবার ফিরে এসেছেন।

লেখক-শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও বেতার ঘোষক



মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *