
আসাদুজ্জামান নূরকে নিয়ে এনসিপির সমালোচনায় বার্গম্যান, কারাবাস নিয়ে প্রশ্ন
সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে কয়েকটি গণমাধ্যমে ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশের সমালোচনা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির এমন অবস্থানের সমালোচনা করে সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বলেছেন, প্রমাণ ছাড়াই ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করছে এনসিপি।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বার্গম্যান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে এনসিপির বর্তমান অবস্থানের মিল রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আসাদুজ্জামান নূরের জন্মদিন উপলক্ষে ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ করায় মা ছ রাঙা টেলিভিশনসহ কয়েকটি গণমাধ্যমের নিন্দা জানিয়ে সম্প্রতি বিবৃতি দেয় এনসিপি।
বিবৃতিতে দলটি দাবি করে, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য নূর আন্দোলনকারীদের হত্যা ও দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে রয়েছেন। তাকে সাবেক সরকারের দীর্ঘদিনের ‘সাংস্কৃতিক স্তম্ভ’ আখ্যা দিয়ে এনসিপি অভিযোগ করে, ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে গণমাধ্যমগুলো ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে।
তবে এনসিপির এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন বার্গম্যান। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুই বছরের বেশি সময় ধরে আসাদুজ্জামান নূর আটক থাকলেও গুলিবর্ষণের ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
বার্গম্যানের ভাষ্য, নূরের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো ভিডিও ফুটেজ, আপত্তিকর ফোনালাপের রেকর্ড, স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য কিংবা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রমাণের মতো কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) প্রকাশ করা হয়নি।
এ ছাড়া বাড্ডা থানার একটি হত্যা মামলায় নূরের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগপত্রেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য নেই বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে প্র থ ম আলোতে প্রকাশিত নিজের সাম্প্রতিক একটি নিবন্ধের কথাও উল্লেখ করেন বার্গম্যান।
বার্গম্যানের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা হচ্ছে।
তিনি লেখেন, এনসিপির উদ্দেশ্য নিয়ে মন্তব্য করতে চান না। তবে দলটির বিবৃতি থেকে এমন ধারণা পাওয়া যায় যে, প্রমাণ ছাড়াই মানুষকে অপরাধের অভিযোগে কারাগারে আটকে রাখার মতো বিচারব্যবস্থায় তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
পুলিশ ও নিম্ন আদালতের আটকসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ে এনসিপির অনাগ্রহেরও সমালোচনা করেন বার্গম্যান। তাঁর মতে, এসব প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিকভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত।
নূরের বিরুদ্ধে ‘নজিরবিহীন দুর্নীতির’ অভিযোগও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন বার্গম্যান। তিনি দাবি করেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেনি।
আসাদুজ্জামান নূরকে ‘ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক স্তম্ভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়টিরও সমালোচনা করেন তিনি। বার্গম্যানের মতে, এ ধরনের বক্তব্যে ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হওয়া নূরের দীর্ঘ অভিনয়জীবনের ইতিহাস উপেক্ষা করা হয়েছে। এমনকি বিএনপির আগের শাসনামলেও তিনি টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন বলে উল্লেখ করেন বার্গম্যান।
এনসিপির বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি অপমানের শামিল।
এ বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন বার্গম্যান। তাঁর অভিযোগ, যেসব দাবির পক্ষে প্রমাণ হাজির করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো প্রতিষ্ঠা করতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের শোককে ব্যবহার করছে এনসিপি।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার ক্ষেত্রে একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন তিনি। বার্গম্যানের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রসঙ্গ ব্যবহার করত।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এনসিপি যদি দেশকে আবারও একই পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে চায়, তবে তা হবে দুঃখজনক। শুধু এবার রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তিত হবে।
বার্গম্যানের মতে, আসাদুজ্জামান নূরকে কারাগারে আটকে রাখার ক্ষেত্রে প্রধান দায় বিএনপি সরকারের। তবে সরকার নির্বিচারে আটকের যে নীতি অনুসরণ করছে, এনসিপি সেটিকে সমর্থন করছে বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাউকে বিচারের মুখোমুখি করতে হলে হত্যা বা হত্যাচেষ্টার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে। অন্যদের মুক্তি দেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা বন্ধ করতে গণমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি। পাশাপাশি একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
উল্লেখ্য, বার্গম্যানের বক্তব্য মূলত আসাদুজ্জামান নূরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আসা তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া। তবে তদন্তকারীদের কাছে অপ্রকাশিত অন্য কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, তা তাঁর বক্তব্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
কুশল/সাএ
মন্তব্য
0 টি মন্তব্য