ভিন্ন স্বাদের খবর

মাটি দিয়ে বিস্কুট! ক্ষুধার তাড়নায় যে খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে মানুষ

প্রকাশিত :
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
/
১৬ বার সংবাদটি দেখেছে

ভাবুন, বাজারে গিয়ে আপনি বিস্কুট কিনলেন। দেখতে বিস্কুটের মতোই—চ্যাপ্টা, গোল, বাদামি রঙের। কিন্তু মুখে দেওয়ার পর বুঝলেন, এটি তৈরি হয়েছে মাটি দিয়ে!

অবিশ্বাস্য শোনালেও এমন ঘটনা সত্যি। ক্যারিবীয় দেশ হাইতিতে দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটের মধ্যে কিছু মানুষ মাটি, লবণ ও চর্বিজাতীয় উপাদান মিশিয়ে তৈরি এক ধরনের শুকনো ‘মাড কুকি’ বা ‘গাতো তে’ খেয়ে আসছেন। তবে এটি কোনো সাধারণ খাবার নয়; বরং ক্ষুধার বিরুদ্ধে মানুষের এক নির্মম বেঁচে থাকার কৌশল।

ছবি: সংগৃহীত

এ বিস্কুটের প্রধান উপকরণই মাটি

হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের দরিদ্র এলাকা Cité Soleil-এ এই মাটির বিস্কুটের ছবি বহু বছর ধরে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে এসেছে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, দেশের মধ্যাঞ্চল থেকে আনা শুকনো হলুদাভ মাটি প্রথমে ছেঁকে পাথর ও ময়লা আলাদা করা হয়। এরপর এর সঙ্গে লবণ ও vegetable shortening বা চর্বিজাতীয় উপাদান মেশানো হয়। মিশ্রণটি পানির সাহায্যে নরম করে ছোট ছোট চ্যাপ্টা চাকতির মতো আকার দেওয়া হয়। পরে সেগুলো রোদে শুকিয়ে শক্ত করা হয়।

দেখতে অনেকটা বিস্কুট বা শুকনো কেকের মতো হলেও এর মূল উপাদান আসলে মাটি।

ছবি: সংগৃহীত

কেন মানুষ মাটি খায়?

উত্তরটি যতটা অদ্ভুত, তার চেয়েও বেশি কঠিন—ক্ষুধা। ২০০৮ সালের একটি Associated Press প্রতিবেদনে হাইতির Cité Soleil এলাকার এক কিশোরীর কথা উঠে আসে। খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের নিয়মিত খাবার জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই ক্ষুধা কমানোর জন্য সে দিনে একাধিকবার মাটির বিস্কুট খাওয়ার কথা জানিয়েছিল।

অর্থাৎ, মানুষ স্বাদের জন্য এই খাবার বেছে নেয় না। অনেকের কাছে এটি হয়ে ওঠে খাবারের অভাবে পেট ভরানোর শেষ উপায়।

২০১০ সালের একটি প্রতিবেদনে এক নারী জানিয়েছিলেন, মাটি দিয়ে তৈরি এই বিস্কুট বিক্রি করে তিনি সন্তানদের দেখাশোনা করতেন। অর্থাৎ এখানে মাটি শুধু খাবার নয়—কারও কারও জন্য আয়েরও উৎস। 

কিছুটা সময়ের জন্য ক্ষুধার অনুভূতি কমতে পারে। কিন্তু এটি প্রধান খাদ্যের বিকল্প নয়। পুরোনো প্রতিবেদনে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, এসব মাটির বিস্কুটের ওপর নির্ভর করলে অপুষ্টির ঝুঁকি থাকে। মাটিতে ক্ষতিকর জীবাণু, পরজীবী বা বিষাক্ত উপাদান থাকতে পারে। অর্থাৎ, পেট ভরলেও শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন, পর্যাপ্ত ক্যালরি ও অন্যান্য পুষ্টি পাওয়া যায় না।

ছবি: সংগৃহীত

হাইতিতে মাটি খাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে শুধু খাদ্যসংকটের সম্পর্ক নেই। ঐতিহাসিকভাবে কিছু মানুষ বিশেষ ধরনের মাটিকে গর্ভাবস্থায় অম্বল বা বমিভাব কমানো এবং খনিজ পাওয়ার উৎস হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু এটিকে নিরাপদ পুষ্টির উৎস হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বীকৃত বিকল্প খাবার মনে করা ঠিক নয়। মাটি খাওয়ার এই প্রবণতার বৈজ্ঞানিক নাম geophagy—অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে মাটি বা মাটিজাতীয় পদার্থ খাওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে geophagy-এর উদাহরণ পাওয়া যায়। তবে হাইতির ‘mud cookies’ বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে চরম খাদ্যসংকট ও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে।

আজও কেন এই গল্প গুরুত্বপূর্ণ?

‘মাটির বিস্কুট’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮–২০১০ সালের দিকে। তাই এটিকে এমনভাবে লেখা ঠিক হবে না যে আজ হাইতির সবাই মাটির বিস্কুট খেয়ে বেঁচে আছে। বরং এর পেছনের বড় বাস্তবতা হলো—হাইতি দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যনিরাপত্তা সংকটে ভুগছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও দেশটিতে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক সংকট ও খাদ্য সরবরাহের সমস্যার কারণে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা গুরুতর হয়েছে। ২০২৬ সালের একটি Reuters প্রতিবেদনে প্রায় ৫.৮ মিলিয়ন মানুষ উচ্চমাত্রার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে থাকার কথা বলা হয়েছে। 

ছবি: সংগৃহীত

তাই মাটির বিস্কুটের গল্প কেবল একটি অদ্ভুত খাবারের গল্প নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়—কোনো সমাজে যখন খাবার মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন বেঁচে থাকার জন্য মানুষ কতটা অস্বাভাবিক পথ বেছে নিতে বাধ্য হতে পারে।

বিশ্বের কোথাও খাবার ফেলে দেওয়া হয়, আবার কোথাও মানুষ খাবারের বিকল্প হিসেবে মাটিকে বিস্কুট বানিয়ে খায়।

তাই হাইতির ‘মাটির বিস্কুট’ যতটা অদ্ভুত, তার চেয়েও বেশি গভীর এর গল্প। এটি কোনো বিচিত্র রেসিপি নয়; এটি ক্ষুধার কাছে মানুষের অসহায় আত্মসমর্পণ এবং একই সঙ্গে বেঁচে থাকার এক নির্মম চেষ্টা।

সূত্র: রয়র্টাস, লস এন্জেল টাইম, দ্যা স্ট্যান্ডার্ড



বাপ্পি/সা.এ

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *