সারাবিশ্ব

দুই দশকের যুদ্ধ শেষে ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা, সুযোগ বাড়ছে ইরানের

প্রকাশিত :
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
/
১৭ বার সংবাদটি দেখেছে

দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাকের সর্বশেষ সামরিক ঘাঁটিগুলো থেকেও মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। বুধবারের মধ্যে দেশটির সবশেষ ঘাঁটি ছাড়ার কথা রয়েছে মার্কিন বাহিনীর। এ প্রত্যাহারকে ইরান ও দেশটির মিত্ররা নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখছে। তবে ইরাকের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ায় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে এবং সুযোগ পেতে পারে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে ইরাক থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তই বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সময়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এমন সময় এই প্রত্যাহার ঘটছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান সরাসরি সংঘাতে জড়িত।

২০০৩ সালে তৎকালীন ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে দেশটি দখলে নিয়ে শিয়া-নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে এবং কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহ দমনে লড়াই চালায়। ২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে প্রত্যাহার করে।

তবে ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পর তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আবার ইরাকে ফিরে আসে মার্কিন বাহিনী। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ইরাকি বাহিনীর সঙ্গে মিলে আইএসের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে তারা।

রয়টার্সের হিসাবে, দুই দশকের বেশি সময়ের যুদ্ধে ইরাকে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের ইরানবিরোধী যুদ্ধে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে নিহত হন। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় এক মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন।

ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায় ইরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ইরাকে তেহরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য হিসেবে কাজ করছিল।

তার মতে, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে।

ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইরাকের সার্বভৌমত্ব বিদেশি সেনার মাধ্যমে নয়, বরং প্রতিরোধ ও জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব।

তবে ইরাকের সব মহলে এই প্রত্যাহারকে স্বস্তির সঙ্গে দেখা হচ্ছে না। ফালুজ্জার সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, ইরাক এখনো পুরোপুরি নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তার মতে, সব ইরাকি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চাইলেও এভাবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের চলে যাওয়ায় যে নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।

ইরানও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম বলেন, মার্কিন সেনারা ইরাক ও পুরো অঞ্চল থেকে চলে গেলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তারা মনে করেন।

এদিকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইসলামিক স্টেট আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা ও ড্রোনের সহযোগিতা না থাকলে আইএসের ঘুমন্ত সেলগুলো পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তার দাবি, মার্কিন জোটের প্রত্যাহারের ঘোষণা আসার পর গত দুই সপ্তাহে আইএসের ঘুমন্ত সেলগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।

ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সন্দেহভাজন একটি আইএস সেল। তাদের মতে, নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ধরনের ফাঁক তৈরি হলে সেটিকে কাজে লাগিয়ে আইএস নিজেদের সক্ষমতার জানান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর মধ্যে ইরাক দীর্ঘদিন ধরেই ব্যতিক্রম। এ কারণে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্যে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।



সাজু/নিএ

মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *