সম্পাদকীয়

বরিশালেও রয়েছে অসংখ্য অপ্রতীম!

প্রকাশিত :
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
/
২০ বার সংবাদটি দেখেছে

দেশের বানী | সম্পাদকীয় ডেস্ক : সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী শিশু অপ্রতীমের নির্মম মৃত্যু সমগ্র দেশকে স্তব্ধ ও শোকাহত করেছে। ঘটনাটি নিঃসন্দেহে একটি মর্মান্তিক অপরাধের প্রতিচ্ছবি। তবে এই মৃত্যুর বেদনার আড়ালে আমাদের সামনে আরও একটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়ে ওঠা অসংখ্য শিশু-কিশোরের নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কতটা সচেতন?

 

অপ্রতীমের মতো অসংখ্য শিশু-কিশোর রয়েছে দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই। বরিশাল নগরীও এর বাইরে নয়। বয়সের স্বাভাবিক চঞ্চলতা, কৌতূহল ও আবেগের সঙ্গে যখন যুক্ত হয় ভুল সঙ্গ, অপরাধপ্রবণ পরিবেশ কিংবা কথিত ‘বড় ভাইদের’ প্রভাব, তখন একটি সম্ভাবনাময় কিশোর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপথে চলে যেতে পারে। ‘কিশোর গ্যাং’ নামের আড়ালে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অপরাধচক্রে কিশোরদের সম্পৃক্ততার ঘটনাগুলো তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি পরিবার ও সমাজের জন্যও গভীর সতর্কবার্তা।

 

কিশোর অপরাধ হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এর শুরুটা অনেক সময় খুব ছোট ছোট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে অতিরিক্ত আড্ডা, নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য, কথিত বড় ভাইদের অনুকরণ, পরিবারকে অবজ্ঞা করা, আচরণ ও ভাষায় উগ্রতা, নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি অনীহা, গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা কিংবা অস্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত অর্থের দাবি—এসবকে নিছক বয়সের স্বাভাবিক আচরণ ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

 

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব পরিবর্তনের অনেকটাই ঘটে অভিভাবকদের চোখের সামনেই। কিন্তু ‘আমার সন্তান এমন করতে পারে না’—এই অন্ধ বিশ্বাস, অতিরিক্ত ব্যস্ততা কিংবা সন্তানের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় না কাটানোর কারণে অনেক পরিবার সময়মতো সতর্ক হয় না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কীভাবে সময় কাটাচ্ছে কিংবা তার আচরণে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অনেক পরিবারের দৈনন্দিন দায়িত্বের অংশ হয়ে ওঠে না।

 

অথচ সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া কিংবা প্রযুক্তির সুবিধা নিশ্চিত করাই অভিভাবকত্বের পূর্ণ দায়িত্ব নয়। তার মানসিক পরিবর্তন বোঝা, বন্ধুত্ব ও সামাজিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে ধারণা রাখা, প্রয়োজনের সময় কঠোর হওয়া এবং একই সঙ্গে ভালোবাসা ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি করাও সমান জরুরি।

 

অবশ্যই কিশোর অপরাধের পেছনে শুধু পরিবারকে দায়ী করা যাবে না। মাদকের বিস্তার, সামাজিক অস্থিরতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, অপরাধীচক্রের প্রভাব, সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগের ঘাটতি—সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ ও অভিভাবক—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার।

 

তবে সমাজ পরিবর্তনের বড় বড় কথা বলার আগে আমাদের নিজেদের ঘরের দিকে তাকানোও জরুরি। কারণ একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবার, আর প্রথম নিরাপদ আশ্রয়ও পরিবার। সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে ‘বয়সের দোষ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া কিংবা পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার অপেক্ষায় থাকা দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।

 

একটি সন্তানকে হারানোর পর তার জন্য বিলাপ করার চেয়ে, সে জীবিত থাকা অবস্থায় তার হাত শক্ত করে ধরা অনেক বেশি জরুরি। শাসন মানে দূরত্ব তৈরি করা নয়; আবার ভালোবাসার অর্থও সীমাহীন ছাড় দেওয়া নয়। প্রয়োজন সচেতন নজরদারি, সময়, সংলাপ, মূল্যবোধ এবং প্রয়োজনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত।

 

অপ্রতীমের মর্মান্তিক মৃত্যু যেন কেবল আরেকটি শোকের ঘটনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। বরিশালসহ দেশের প্রতিটি পরিবার এখনই নিজেদের সন্তানের দিকে নতুন করে তাকাক। সমাজকে দোষারোপ করার আগে আমরা প্রত্যেকে নিজের ঘরটি কতটা নিরাপদ রাখতে পেরেছি, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। সময় থাকতে সন্তানের হাত শক্ত করে ধরা—অপ্রতীমের মতো অকালমৃত্যুর সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা হোক সেটিই।



মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *