বরিশাল নিউজ

বরিশালে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই ক্লাস করছেন কোমলমতি শিক্ষার্থীরা!

প্রকাশিত :
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
/
১৫ বার সংবাদটি দেখেছে

দেশের বানী | স্টাফ করেসপন্ডেন্ট : বরিশাল বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৮৭১টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরাজীর্ণ এসব ভবনের কোনোটি যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন এসব বিদ্যালয়ে পাঠ নিতে যাচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

 

ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর অনেক ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। কোথাও দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় ফাটল, আবার কোথাও ছাদের রড বের হয়ে গেছে। দরজা-জানালাও ভাঙাচোরা। সামান্য বৃষ্টি হলেই কোনো কোনো বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে। শ্রেণিকক্ষ সংকট ও পর্যাপ্ত আসবাবপত্রের অভাবও রয়েছে অনেক বিদ্যালয়ে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।

 

বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬ হাজার ২৪৩টি। এর মধ্যে ৮৭১টি বিদ্যালয় ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

 

তালিকা অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বরিশাল জেলায়। এ জেলায় ৩২০টি বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া পিরোজপুরে ১৯৯টি, বরগুনায় ১৩২টি, ভোলায় ১১৫টি, ঝালকাঠিতে ৮৫টি এবং পটুয়াখালীতে ২২টি বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর এসব বিদ্যালয়ের ভবন সংস্কার কিংবা নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে ভবনগুলোর অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ছে।

 


আরও পড়ুন : বরিশালে সমিতির আড়ালে গ্রাহকের সর্বনাশ!


 

বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক বিদ্যালয় ভবনের দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। কোনো কোনো ভবনের ছাদে রড বেরিয়ে পড়েছে। আবার বৃষ্টির পানি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে পড়ায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকরা।

 

বাকেরগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন অভিভাবক জানান, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর পর তারা সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকেন। জরাজীর্ণ ভবনে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকায় সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না তাদের। পাশাপাশি অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত বেঞ্চ ও আসবাবপত্র না থাকায় শিক্ষার্থীদের মেঝেতে বসে ক্লাস করতে হচ্ছে।

 

বাবুগঞ্জ উপজেলার ছানিকেদারপুর বিদ্যালয়ের চিত্রও নাজুক। স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৯৯৭ সালে নির্মাণের পর বিদ্যালয় ভবনটিতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বা সংস্কার হয়নি। দীর্ঘদিনের অযত্নে ভবনটির অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। উপজেলার আরও অন্তত ডজনখানেক বিদ্যালয়ের অবস্থাও একই রকম বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

 

দেহেরগতি ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহজাহান হাওলাদার বলেন, ছানিকেদারপুর বিদ্যালয়সহ উপজেলার বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের ভবন দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত এসব বিদ্যালয়ে উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

 

একাধিক শিক্ষক জানান, ভবনের অবস্থা খারাপ হওয়ায় বর্ষাকালে পাঠদান সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হয়। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। এতে ক্লাসের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের মধ্যেই আতঙ্ক তৈরি হয়।

 

শিক্ষকদের ভাষ্য, বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের ভবন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে সেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করার উপযোগী। কিন্তু বিকল্প ভবন বা নতুন ভবন নির্মাণ না হওয়ায় পুরোনো ভবনেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

 

বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, জেলার ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর তালিকা তৈরি করে শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত এসব তালিকা অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও নিরাপত্তাঝুঁকি কমবে।

 

বরিশাল জেলা শিক্ষা প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনগুলো চারটি ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব বিদ্যালয়ের সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

 

অভিভাবক ও স্থানীয়দের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত প্রকৌশলগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার, পুনর্নির্মাণ বা নতুন ভবন নির্মাণ করা জরুরি। একই সঙ্গে নতুন ভবন নির্মাণের আগ পর্যন্ত অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।



মন্তব্য

0 টি মন্তব্য
👤
মন্তব্য লোড হচ্ছে...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *